রাজশাহীর কাপাসিয়ার গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা শাওন আলী দেশের ভলিবল অঙ্গনের এক চেনা নামে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু এই সাফল্যের যাত্রাটা মসৃণ ছিল না। ২০১৬ সালে বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন বুকবেঁধে যখন ঢাকায় পা রাখেন, তখন ইস্ট এন্ড ক্লাবের অপরিচিত জগৎ তাকে ভীষণভাবে দিশেহারা করে ফেলেছিল।

রাজধানীর যান্ত্রিক পরিবেশ আর ভলিবারের জটিল কৌশল শুরুতে তার কাছে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করে শাওন জানান, প্রথম দিকটা ছিল ভীষণ কঠিন। অনেক কিছুই বোঝার বাইরে থেকে যেত এবং খেলাটাও খুব জটিল লাগত। হতাশার মূহুর্তে মনে হত, আর নয়, খেলাই ছেড়ে দেবেন। ঠিক এমনই এক সংকটাপন্ন সময়ে তার চাচা সাদেক আলীর কিছু কথা ছিল অমৃততুল্য। ইসলামাবাদ থেকে মোবাইল ফোনে শাওন বলেন, তার চাচা তাকে বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন এবং একদিন নামী খেলোয়াড় হবার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

সাদেক আলী নিজেও একজন ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ দলের হয়ে খেলার পর অবসর গ্রহণ করেন। চাচার সেই প্রেরণাই নতুন উদ্যমে লড়বার শক্তি জোগায় শাওনকে। এরপর ইস্ট এন্ড ক্লাব ছেড়ে তিনি যোগ দেন তিতাস ক্লাবে, আর এখানেই তার ক্যারিয়ারের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পালটে যায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় এই দলটির হয়ে প্রতিটি অনুশীলন ও ম্যাচ তাকে ক্রমশ পরিপক্ব করে তোলে। শাওনের নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী, তিতাস ক্লাবেই তার সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলি কেটেছে। যে তরুণ এককালে খেলার গতি-প্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারতেন না, তিনিই এখন কোর্টের রক্ষণভাগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়।

তিতাস ক্লাবে অসাধারণ নৈপুণ্যের সুবাদে ২০২১ সালে তার ভাগ্য পরিবর্তনের ডাক আসে। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ওঠার পর থেকে আর পিছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বুধবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সমাপ্ত সেন্ট্রাল এশিয়ান ভলিবল চ্যাম্পেনশিপে (কাভা) দারুণ ভূমিকা রেখে শাওন সেরা লিবেরোর স্বীকৃতি অর্জন করেন। প্রতিপক্ষের একাধিক দ্রুতগতির স্ম্যাশ তিনি মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসাধারণ দক্ষতার সাথে প্রতিহত করে থাকেন।

চাচার হাত ধরে ভলিবার জগতে আসা এই খেলোয়াড় এখন নিজেই একটি অনুপ্রেরণার নাম। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ছোট ভাই সবুজ আলীও ভলিবলী এসেছেন, এবং বর্তমানে তিনি সেনাবাহিনীর হয়েই খেলছেন। শাওন বলেন, সবুজের বড় স্বপ্ন হল জাতীয় দলের জার্সি পড়া। অবসর পেলে তিনিও ভাইকে নানারকম পরামর্শ দেন। করাচি হয়েই বৃহস্পতিবার ভোরে সেরা লিবেরোর পদক ও একবুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঢাকায় প্রত্যপবর্তন করেন শাওন। এই পুরষ্কার কেবল ধাতব বস্তুই নয়, বরং তা দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও ত্যাগের প্রতিচ্ছবি। এটিকেই সম্বল করে তিনি আরও উপরে উঠতে চান। ভবিষ্যতের লক্ষ্য পর্দতে তিনি জানান, আগামী বছর পাকিস্তানেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এসএ গেমসে অংশ নিয়ে তার দলের একটি করে পদক জয় করা এখন সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। শাওনের জীবন বৃত্তান্ত যেন বলছে, পরিশ্রম এবং ধৈর্য থাকলে যেকোনো অপরিচিত জগতকেও জয় করা সম্ভব।