বছরের শুরু থেকে শেয়ারবাজারকে সংজ্ঞায়িত করা সেমিকন্ডাক্টর স্টকের একমুখী বাণিজ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে অর্থ ঢালার ধারা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফিলাডেলফিয়া স্টক এক্সচেঞ্জ সেমিকন্ডাক্টর সূচক (SOX) জুলাই মাসে ২১ শতাংশ পতনের সম্মুখীন হয়েছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এক মাসে সর্বোচ্চ পতন।

বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি চিপ নির্মাতা কোম্পানির সূচক SOX, গত মাসের প্রায় অর্ধেক কার্যদিবসেই কমপক্ষে ৪ শতাংশ ওঠানামা করেছে। এমনকি জুলাইয়ের সবকটি ২২টি কার্যদিবসেই অন্তত ২ শতাংশ অন্তর্দৈনিক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে, যা ২০২০ সালের পর ঘটেনি। প্যাভ ফাইন্যান্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা স্টিফেন ইভান্স মন্তব্য করেছেন, "এই অস্থিরতা আসলে সাধারণ অনিশ্চয়তার মাত্রাই নির্দেশ করে, কেউই জানে না পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমার মনে হয় চক্রটি এখনও কিছুটা বাকি আছে এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘকালীন অবস্থানে থাকতে পারেন, তবে ডিজনি ওয়ার্ল্ডের রোলার কোস্টারের মতো ধকল সহ্য করার ক্ষমতা রাখতে হবে।"

এদিকে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন ব্যয় পরিকল্পনার ওপর বাড়তি নজরদারির কারণেও এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা এই ব্যয়ের স্থায়িত্বর উপর সংশয় সৃষ্টি করছে। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং উন্মুক্ত-উৎসের এআই মডেলের প্রসার— যা কম খরচে ও কম অবকাঠামো ব্যবহার করে সচল থাকে—বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে যে চিপ স্টকগুলোর সোনালী দিন হয়তো অতীতে হয়ে গেছে। মাসের শেষ দুই দিনে ৮.৩ শতাংশ উত্থান সত্তেও, SOX সূচকটি জুনের ২২ তারিখের রেকর্ড উচ্চতার থেকে এখনও ২৩ শতাংশ নিচে রয়েছে। এই সময়ে সূচকের সব কটি স্টকেরই দর পতন ঘটেছে, যার অর্ধেকেরও বেশি কমপক্ষে ২৫% মূল্য হারিয়েছে।

কিছু বিনিয়োগকারী এই ধারাবাহিক পতনকেক এতোটাই চরম মনে করছেন যে তারা স্বল্পমেয়াদে এটি একটি ক্রয় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে চিপ স্টকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ভ্যালুওয়ার্কসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা চার্লস লেমনাইডস বলেন, "এই দরে পতনের পর চিপ স্টকে একটি শক্তিশালী উত্থান দেখলেও আমি অবাক হব না, তবে মনে হয় না যে তারা ষাঁড়ের বাজারের পরবর্তী ধাপে নেতৃত্ব দেবে। তাদের সোনালা দিন শেষ।"

জুলাইয়ে AI খাতের স্টকের দ্রুত পতনের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যেতে শুরু করেছে। লিওপোল্ড অ্যাসব্রেনারের নেতৃত্বধীন হেজ ফান্ড সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস, এইসব বিনিয়োগ দ্রুত লোকসানে পড়ায় মার্জিন কল মেটাতে বিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি শেয়ার বিক্রয় করতে বাধ্য হয়েছে। ফান্ডটি সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারী স্যানডিস্ক কর্পোরেশনসহ Aআই-এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিল, যার শেয়ার মূল্য জুলাইয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, প্রথম ছয় মাসে ৮৫৮% বেড়ে যাওয়ার পর।

স্পষ্টতই, যে স্টকগুলি এ বছর দ্বিগুণ, তিনগুণ বা চারগুণ মূল্য বেড়েছে, বিনিয়োগকারীরা তা থেকে মুনাফা তুলছেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের উদ্দীপনায় এই তীব্র রদবদলই হলো সেই কেন্দ্রীয় ধারণার প্রতি ক্রমবর্ধমান সংশয়ের ইঙ্গিত, যা এই উত্থানের ইন্ধন জুগিয়েছিল। তবুও, সামনের বছরগুলোর জন্য শিল্পটির প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি এখনও গোলাপীই রয়েছে, বিশ্লেষকরা এনভিডিয়া কর্পোরেশন এবং ব্রডকম ইনকরপোরেশনের মতো সংস্থার মুনাফা দ্রুত বাড়তে থাকার কথাই বলছেন। সম্প্রতি অ্যামাজন ডট কম ইনক. ও মাইক্রোসফট কর্পোরেশন আগামী এক বছরে AI-বাবদ কয়েক হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যাক্ত করেছে, যার সিংহভাগ অর্থই ডাটা সেন্টারের চিপ নির্মাতাদের জন্য বরাদ্দ।

সমস্যা হচ্ছে এর বাইরের মৌলিক চিত্রটি প্রশ্নের সম্মুখীন। চিপ স্টক, বিশেষ করে মেমোরি চিপ্পকরা, কুখ্যাতভাবে চক্রাকার, চাহিদার ওঠানামার সঙ্গে নিয়মিত উথান-পতন ঘটে। ওয়াল স্ট্রিটের অনেকেই দৃঢ়বিশ্বাসী যে এই চক্রটিও তার ব্যতিক্রম হবে না। ভ্যালুওয়ার্কসের লেমনাইডস বলেন, "আমরা যে মুনাফার বিস্ফোরণ দেখেছি তা টেকসই নয়।" তার মতে, বড় প্রশ্ন হল মার্জিন টেকসই হবে কি না, কারণ "মার্জিনগুলি ঐতিহাসিক নিয়মের সাথে এতটাই বেসামঞ্জ্যপূর্ণ যে এগুলো কমে আসাটাই যুক্তিসংগত। প্রশ্ন হলো কখন হবে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে স্টক কী করবে।"

SOXের গত ৬০ দিনের প্রকৃত অস্থিরতা পরিমাপক সূচক কোভিড মহামারির শুরু থেকে সর্বোচ্চ পঠনে উঠেছে। গত দুই দশকে শুধু বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ই এটি এই স্তরে পৌঁছেছিল। জুলাইয়ের এই দরে SOXের বাজার মূলধন থেকে ২.২ ট্রিলিয়ান ডলার উধাও হয়ে যায়। বড় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে টাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির মার্কিন ডিপোজিটরি রশিদ, যা জুলাইয়ে ১৫% পরে ৩৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজার মূল্য হারায়, অথচ মাসের মাঝামাঝি কোম্পানিটি ব্যয় ও আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়েছিল। এরপরেই রয়েছে মাইক্রন টেকনোলজি ইনকরপোরেটেড, যার ২৯% দরপতন এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক পতন এবং এতে ৩৭৪ বিলিয়ন ডলার মূল্য লোপ পেয়েছে। সবশেষে, ইন্টেল কর্পোরেশন মাসটিতে ৩৫% দরে পড়ে প্রায় ২৪৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা সেপ্টেম্বর ২০০০ সালের পর কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় মাসিক পতন।

তবে চিপ স্টকের ভিন্নধর্মী গতিপথের প্রতিফলনেই এনভিডিয়া ও ব্রডকমের মতো কিছু বড় নামের শেয়ারদর মাসে বেড়েছে। ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের মতে, চিপ স্টকের এই অস্থিরতার প্রতিক্রিয়ায় খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঐতিহাসিক পরিমাণ লেনদেন দেখে গেছে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা শুধু গত সপ্তাহেই সেমিকন্ডাক্টর-সংক্রান্ত এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ETF) রেকর্ড ১২ বিলিয়ন ডলার নীট বিনিয়োগ করেছেন। BI বিশ্লেষক এরিক বালচুনাস লেখেন, "সেমিকন্ডাক্টর ইটিএফগুলোর লেনদেন বা প্রবাহের দিক থেকে এতটা কার্যক্রম আগে কখনও দেখা যায়নি।" তিনি আরও উল্লেখ্য করেন, এই ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ কেবল একটি রেকর্ডই নয়, বরং সমগ্র ETFে গত পাঁচ দিনের মোট নিট বিনিয়োগের ২৫%। অথচ সেমিকন্ডাক্টর ETFs মোট ETF সম্পদের মাত্র ১% প্রতিনিধিত্ব করে।