দীর্ঘ প্রায় বারো বছর পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পথ সুগম হয়েছে। গত ২ জুলাই আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে সব আইনি বাধা অপসারিত হওয়ায় এখন প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। তবে এই স্বস্তির পাশাপাশি নতুন করে জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন অনেকে। রংপুর বিভাগের এক সহকারী শিক্ষক, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তিনি জানান, আদালতের রায়ে আশা ফিরেছে। দীর্ঘ চাকরিজীবনের বেশির ভাগ সময় একই পদে কাটানোর পর এখন তাদের প্রত্যাশা, অধিদপ্তর যত দ্রুত সম্ভব প্রজ্ঞাপন জারি করে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করুক। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক কোনো ধীরগতি যেন এই সুযোগকে নষ্ট না করে।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদ শূন্য রয়েছে। পদোন্নতি কার্যক্রম সম্পন্ন হলে এই দীর্ঘদিনের নেতৃত্বসংকট অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শিক্ষকেরা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘকাল প্রধান শিক্ষকের অভাবে অনেক বিদ্যালয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, তারা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। আদালতের রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পেলেই গ্রেডেশন তালিকা থেকে শুরু করে বিধি অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
এই জটিলতার সূত্রপাত ২০১৩ সালে, যখন বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। এরপর থেকেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বারো বছরের বেশি চাকরির অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও হাজারো সহকারী শিক্ষক একই পদে আটকে ছিলেন। অনেকেই পদোন্নতি না পেয়ে অবসরে গেছেন। বহু বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর নিয়োগ বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে আদালতে রিট করেন শিক্ষকদের একটি অংশ। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট ওই বিধির কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করলে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করায় প্রায় এক যুগের জটের অবসান হয়। তবে শুধু মামলাই নয়, বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের বিভক্তি, পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ মামলাও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করেছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা অঞ্চলের এক সহকারী শিক্ষক, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, বলেন, নেতাদের বিরোধ ও মামলার বোঝা সাধারণ শিক্ষকদেরই বহন করতে হয়েছে। এখন সব আইনি বাধা দূর হয়েছে, তাই দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির দাবি তাদের। এর ফলে শুধু পেশাগত বঞ্চনার অবসানই হবে না, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোও স্বাভাবিক হবে।
পদোন্নতি সম্পন্ন হলে নতুন করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পথও খুলবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান শূন্য পদের সঙ্গে মিলিয়ে মোট ৩৮ হাজার ৪৩৩ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আদালতের রায়ের পর এখন আর কোনো আইনি বাধা না থাকায় গ্রেডেশন তালিকা চূড়ান্ত, প্রজ্ঞাপন জারি ও পরবর্তী নিয়োগ—সবকিছুই নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।




