বিশ্বকে এইডস-মুক্ত প্রজন্ম উপহার দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন বিল গেটস। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমানে গেটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিল গেটস ১২ জুলাই পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে এক দীর্ঘ পোস্টে এইচআইভি ও এইডসের অবসানের বিষয়ে নিজের ভাবনা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কল্যাণে প্রথমবারের মতো বাস্তবসম্মতভাবে এইডসকে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে নির্মূল করা সম্ভব।
গেটস স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, তাঁর লক্ষ্য এইচআইভি ভাইরাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা নয়। বরং তিনি এইডসের অবসান বলতে বোঝাতে চেয়েছেন এমন একটি ভবিষ্যৎ যেখানে আক্রান্তদের সিংহভাগ এমন ওষুধ পাবেন যা তাদের এইডস হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং একসময় নিরাময়ও মিলবে। এর ফলে নতুন সংক্রমণের হার নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। তাঁর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ দশকের শেষের দিকে ২০১০ সালের তুলনায় মৃত্যু ও নতুন সংক্রমণের হার ৯০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হবে। এর ফলে নিম্ন আয়ের দেশগুলো এইচআইভি চিকিৎসার পেছনের বিপুল ব্যয় অন্যান্য রোগের লড়াই ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবে এবং দ্রুত স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাবে।
এই অভূতপূর্ব সাফল্যের সম্ভাবনার পেছনে তিনি তিনটি প্রধান চালিকাশক্তি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ওষুধ। প্রতিদিনের পিলের পরিবর্তে লেনাকাপ্যাভির নামক একটি ইনজেকশন মাত্র একটি ডোজে ছয় মাস সুরক্ষা দিতে পারে। গেটস ফাউন্ডেশন ভারতের ওষুধ প্রস্তুতকারক হেটেরোর সঙ্গে মিলে এর একটি জেনেরিক সংস্করণ তৈরিতে কাজ করছে, যার বার্ষিক খরচ রোগীপ্রতি মাত্র ৪০ ডলার হবে। নিম্ন আয়ের দেশগুলো ২০২৭ সালের শুরুতেই এটি পেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ইতোমধ্যে গ্লোবাল ফান্ড ও পেপফার গিলিয়েডের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ৩০ লাখ মানুষের কাছে এটি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একটি কার্যকর নিরাময়। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে জেনেটিক এডিটিং ব্যবহার করে এমন একটি একক ইনজেকশন পদ্ধতি পরীক্ষা করছেন, যা কোষে এইচআইভির প্রবেশ রোধ করবে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখাবে। গেটস একে ‘ফাংশনাল কিওর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে ভাইরাস শরীরে থেকে গেলেও তা আর এইডসে রূপ নেবে না এবং রোগীকে আর কোনো পিল খেতে হবে না। সিকল সেল রোগের জন্য অনুরূপ নিরাময় পাঁচ বছরের মধ্যে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এইচআইভির ক্ষেত্রে আরও সময় লাগবে বলে তিনি মনে করেন।
তৃতীয়ত, ইতোমধ্যে হাতে থাকা বিদ্যমান সরঞ্জাম যেমন কনডম, স্বেচ্ছায় পুরুষের খতনা ও মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ রোধী ওষুধ। ২০১০ সালের পর থেকে এসবের কারণে বৈশ্বিক নতুন সংক্রমণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে।
তবে গেটস একটি বড় উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন। বিভিন্ন দেশের সরকার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে তহবিল কমিয়ে দিচ্ছে। এই বাজেট কর্তনের ফলে সেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৬৬ লাখ নতুন সংক্রমণ ও ৪২ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে বহু গবেষণা কার্যক্রম থমকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দানশীলতা কখনো সরকারের নেতৃত্ব ও সম্পদের বিকল্প হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশ যদি আগের মতো উদার ভূমিকায় ফিরে আসে, তবে তাদের নেতারা ইতিহাসে এইডসের অবসান ঘটানো নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
নিজের বার্তার সারমর্মে গেটস বলেন, বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি করবেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন, তবে সরকারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং যে বিনিয়োগ আমাদের এত দূর এনেছে তাতে পুনরায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। তবেই অর্ধশতাব্দী ধরে মানবতাকে ধ্বংস করা এই মহামারির অবসান ঘটানো সম্ভব।

