মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করতে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০২৬-এ ব্যাপক ক্ষমতা ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে। বৃহস্পতিবার এই আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে এতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা ছাড়া মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারত না অধিদপ্তর। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র না থাকায় অভিযানে গিয়ে মারধরের শিকার হওয়ার নজিরও ছিল। এখন সেই বাধা দূর হচ্ছে।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন পোশাক ও আগ্নেয়াস্ত্রসজ্জিত জনবলসংবলিত একটি বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে গণ্য হবে। অধিদপ্তরের আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে অস্ত্র, গোলাবারুদ বহন, ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। প্রধান কার্যালয়সহ সব অফিস ভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে নিজস্ব অস্ত্রাগার নির্মাণ করা হবে। পুরুষ ও নারীর জন্য পৃথক হাজতখানাও থাকবে প্রতিটি কার্যালয়ে, যেখানে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে তোলার আগে আটক রাখা যাবে। শিশুদের জন্য শিশু আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদক শনাক্তে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার, উদ্ধার আলামত রাখার জন্য মালখানা স্থাপন এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মামলার বিচার সম্পন্ন করাটা সার্বিক কার্যক্রমকে গতিশীল করবে বলে মনে করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। তাঁর মতে, এসব ব্যবস্থা মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
মাদক মামলার বিচার নিশ্চিত করতে প্রতি জেলার আদালত ভবনে প্রসিকিউশন শাখা স্থাপন করবে অধিদপ্তর। এই শাখাগুলো মামলা পরিচালনা, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে সহায়তা ও সমন্বয় এবং আদালতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সরবরাহ করবে। এছাড়া প্রতিটি থানায় মাদক অপরাধের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ সেল থাকবে।
পাঁচ বছর বা ততোধিক মেয়াদের কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ আমলে নেওয়ার জন্য প্রতিটি জেলা ও মহানগর এলাকায় এক বা একাধিক মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো এলাকায় ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হলে সেখানকার আদালতের এখতিয়ার বিলুপ্ত হবে এবং বিচারাধীন মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হবে।
সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মাদক কারবারের বিষয়ে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল ডিভাইস, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা বা সরবরাহের চেষ্টা করলে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এই অপরাধে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড ও অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মাধ্যমে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ করলে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সাধারণত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হয়ে ওঠে। আগে অভিযানে গিয়ে অধিদপ্তরের সদস্যরা হামলার শিকার হতেন। এখন তারা সুসংগঠিত হয়ে অস্ত্র হাতে মাদক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারবেন। ডগ স্কোয়াড তাদের মাদক শনাক্তে সহায়তা করবে এবং অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগও বাড়ানো হয়েছে সংশোধিত আইনে। বিশেষ তল্লাশি ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং নতুন ধরনের মাদক মোকাবিলায় একাধিক বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।




