জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে দেশের রাজনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও, সংস্কার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা গত আড়াই দশকের ধ্বংসপ্রাপ্ত নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংসদ সাধারণ কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়নি; এর রাজনৈতিক মালিকানা অভ্যুত্থানের শহীদ ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা সত্ত্বেও, সংসদে সেই বোধের প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।

সরকারি দল ও বিরোধীপক্ষ উভয়ই অভ্যুত্থানের মালিকানা দাবি করলেও, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন ও কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যাদের প্রতিবেদন ও সুপারিশ সংসদে উপস্থাপিত হলেও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। নির্বাচনী ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, নারীবিষয়ক ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত কমিশনের সুপারিশগুলো অগ্রাহ্য রেখেই চলছে রাজনৈতিক কার্যক্রম।

শ্রমিক সমাজের প্রতিও অবহেলা স্পষ্ট। অভ্যুত্থানে ব্যারিকেড গড়া যাত্রাবাড়ী, সাভার ও গাজীপুরের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ সংসদ নেয়নি। অথচ ২০২৬ সালে পোশাকসহ ১৩টি খাতে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার সময়সীমা থাকলেও তা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। প্রথম ছয় মাসে পোশাক খাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা এবং ৫৩ মাস ধরে মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় জীবনযাত্রার চাপ ক্রমশ বাড়ছে। সরকারের প্রথম বাজেটে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বরাদ্দ থাকলেও বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য একই উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপরিবর্তিত রূপও সমালোচিত হয়েছে। বিএনপি এখনও একক নেতৃত্বকেন্দ্রিক, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব রয়েছে। নবীন রাজনৈতিক দলগুলোতেও দুর্নীতির খবর আসায় অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। দুদকের স্বাধীনতা ও শক্তিশালীকরণের প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে এসেছে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগে সার্চ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না থাকায় সংস্থাটির জবাবদিহিতা দুর্বল থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভ্যুত্থানের পর নাগরিক সমাজও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ অভ্যুত্থানের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাধারণ মানুষ আবার নিজেদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ফিরে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আবু সাঈদসহ শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে প্রত্যাশা ছিল, তা কি পূরণ হচ্ছে? দুই বছরেও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ রেখে অভ্যুত্থানের চেতনা উদযাপনের কোনো অর্থ আছে কি না—এই বাস্তবতাই এখন সামনে।