বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দরপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্থানীয় সময় আজ সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১.৬০ ডলারে নেমে এসেছে। গতকাল সকালের তুলনায় এটা ৯৪ সেন্ট কম, তবে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এখনও প্রায় ২৫ ডলার বেশি। এক মাস আগে এই দাম ছিল ৭৬.৫৬ ডলার, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১৯.৬৪ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৩৭.৭০ শতাংশ।

তেলের দামের এই ওঠানামা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থাকলেও ভবিষ্যতে দাম কোন পথে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ওপরই নির্ভর করে তেলের বাজার। অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, যুদ্ধ বা যেকোনো বড় সংকট দেখা দিলেই তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

গাড়িতে জ্বালানি ভরার সময় যে দাম দেখেন, তা শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম দিয়েই নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিশোধন খরচ, পাইকারি পরিবহন, বিভিন্ন কর এবং স্থানীয় পাম্প মালিকের লাভের অংশ। তবে চূড়ান্ত খুচরা দামের অর্ধেকের বেশি অংশই নির্ভর করে অপরিশোধিত তেলের ওপর। তেলের দাম বাড়লে দ্রুতই পেট্রলের দাম বাড়ে, কিন্তু দাম কমলে ভোক্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সুবিধা পান না; ধীরে ধীরে কমে — এই প্রবণতাকে অর্থনীতিতে 'রকেটস অ্যান্ড ফেদারস' বলা হয়।

জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিষেধাজ্ঞা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের মতো সংকটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দামের আকস্মিক উল্লম্ফন রোধে এই মজুদ তৎক্ষণিক সহায়তা দিতে পারে, তবে এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। জ্বালানি-নির্ভর শিল্প, জরুরি পরিষেবা এবং গণপরিবহন চালু রাখতে এটি সাময়িক সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস — এই দুই জ্বালানি উৎসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তেলের দাম বেড়ে গেলে কিছু শিল্পখাত যেখানে সম্ভব, সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার শুরু করতে পারে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যায়।

ঐতিহাসিকভাবে তেলের দাম কখনোই স্থিতিশীল ছিল না। ব্রেন্ট ক্রুড আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান মানদণ্ড, আর উত্তর আমেরিকার প্রধান মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই। বিশ্বের বেশিরভাগ অপরিশোধিত তেলের লেনদেন ব্রেন্টের ভিত্তিতেই হয় বলে এটি আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও এখন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্রেন্টকেই প্রাথমিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে। গত কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটে দাম বেড়েছে, আবার বিশ্বব্যাপী মন্দা ও উদ্বৃত্ত সরবরাহে দামে ধস নেমেছে।

সাতের দশকের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় এবং ইয়োম কিপুর যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় প্রথম বড় তেল সংকট দেখা দেয়। আশির দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়া এবং ওপেকের বাইরে নতুন উৎপাদকদের আবির্ভাবে দাম পড়ে যায়। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী চাহিদা বাড়ায় দাম আবার চূড়ায় ওঠে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই আর্থিক সংকটে ভেঙে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড লকডাউনের সময় তেলের চাহিদা অভূতপূর্বভাবে কমে দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের নিচে নেমে যায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, তেলের বাজার যুদ্ধ, মন্দা, ওপেকের সিদ্ধান্ত, নতুন জ্বালানি নীতি — এমন অসংখ্য কারণের প্রভাবে চিরকালই অস্থির। ফরচুন সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের 'সুরক্ষা' চাঁদার প্রস্তাব, ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জেলিফিশের প্রভাবে ৩.২ গিগাওয়াট ক্ষতি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকিতে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের পতনের খবর প্রকাশ করেছে।

প্রতিদিন তেলের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়? এর মূল ভিত্তি সরবরাহ ও চাহিদা, সাথে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সরবরাহ-চাহিদা নিয়ে খবরও দামে প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনের নীতি, যেমন তুরপুনের অনুমতি দেওয়া, ভবিষ্যতের সরবরাহের প্রত্যাশা বদলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজে ১৫ লাখ একরের বেশি জমিতে তেল-গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি দেয়, যা বিডেন প্রশাসনের নীতির বিপরীত ছিল।

ফিউচারস মার্কেট খোলা থাকলে দিনের যেকোনো সময় তেলের দাম পরিবর্তিত হতে পারে। ফিউচারস মার্কেট মূলত নিলামের মতো, যেখানে ভবিষ্যতে তেল কেনা-বেচার চুক্তি হয়। যতক্ষণ চুক্তি লেনদেন চলবে, ততক্ষণ দামও বদলাতে থাকবে।

মার্কিন শেল তেল উৎপাদন দামের ওপর প্রভাব ফেলে। শেল হলো এমন এক ধরনের শিলা যাতে তেল ও গ্যাস জমা থাকে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি শেল তেল উত্তোলন করবে, সরবরাহ তত বাড়বে এবং দাম বৃদ্ধির চাপ তত কমবে। অন্যদিকে, তেলের দাম বেড়ে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যায়। গরম বা গ্যাসের বিল তো বাড়েই, সাথে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দামও চড়া হয়ে ওঠে।