গণিতের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেলের ৯০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে এই সম্মান লাভ করেন ইরানের গণিতবিদ মরিয়ম মির্জাখানি। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিতবিদ কংগ্রেসে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে এই অর্জন গণিত জগতে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে।

মির্জাখানির গবেষণার মূল ভিত্তি ছিল তাত্ত্বিক গণিত, বিশেষত রিম্যান তল (Riemann Surfaces), হাইপারবোলিক জ্যামিতি এবং মডুলাই স্পেস। সরল ভাষায়, যেখানে পৃষ্ঠতলে ছিদ্র বা জটিল আকৃতি থাকে, সেখানে বিশেষ জ্যামিতিক কাঠামো তৈরি হয়। তিনি এই ধরনের জটিল রিম্যান তলের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গভীর গবেষণা চালান।

আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়ন (IMU) তাঁর তিনটি প্রধান অবদানের জন্য ফিল্ডস মেডেল প্রদান করে। প্রথমত, তিনি প্রমাণ করেন যে একটি হাইপারবোলিক পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট এবং পরস্পরকে কখনো ছেদ করে না—এমন সরল বদ্ধ জিওডেসিকের সংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি পায়। এই ফলাফল জ্যামিতির একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে নতুন পথ দেখায়। দ্বিতীয়ত, তিনি মডুলাই স্পেসের ওয়েইল-পিটারসন আয়তন নির্ণয়ের জন্য এক নতুন গাণিতিক কৌশল উদ্ভাবন করেন, যা আধুনিক জ্যামিতিতে যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত। তৃতীয়ত, তিনি এডওয়ার্ড উইটেনের বিখ্যাত অনুমানের একটি নতুন জ্যামিতিক প্রমাণ দেন। তাঁর উদ্ভাবিত পুনরাবৃত্তিমূলক সূত্র ব্যবহার করে তিনি মডুলাই স্পেসের আয়তন বের করেন, যা জ্যামিতি, টপোলজি ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করে।

গণিতচর্চায় মির্জাখানির পদ্ধতি ছিল অনন্য। তিনি টেবিলে ছোট কাগজে হিসাব না করে মেঝেতে বড় সাদা কাগজ বিছিয়ে ছবি আঁকতেন, রেখা টানতেন এবং গ্রাফ তৈরি করতেন। তাঁর ছোট মেয়ে মজা করে বলত, ‘মা আবার পেইন্টিং করছে!’ মির্জাখানি নিজেও বলেছিলেন, ‘গণিত করার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এটা যেন একটি গভীর বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে নতুন পথ খোঁজার মতো।’

ফিল্ডস মেডেল পাওয়ার মাত্র তিন বছর পর, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪০ বছর বয়সে এই মহান গণিতবিদ মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর কাজ ও অনুপ্রেরণা চির অম্লান। মির্জাখানি প্রমাণ করেছেন যে মেধা ও অধ্যবসায়ের কাছে লিঙ্গ বা ভৌগোলিক সীমারেখা কোনো বাধা নয়। তাঁর জন্মদিন ১২ মে-কে স্মরণ করে ২০১৯ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নারী গণিত দিবস পালিত হয়। মির্জাখানি আমাদের শিখিয়েছেন, গণিত কেবল কঠিন সমীকরণের সমষ্টি নয়, বরং মনের ক্যানভাসে আঁকা এক অনন্ত শিল্প।