কারও সাথে আলাপের সময় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দৃষ্টি যায় তার চোখের দিকে। নীল, সবুজ কিংবা বাদামি রঙের মণি আমাদের নজর কাড়লেও চোখের একটি অংশ প্রায় উপেক্ষিত থেকে যায়— সেটি হলো এর সাদা অংশ। অথচ এই আপাতসাধারণ সাদা অংশই মানুষের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও যোগাযোগের পেছনে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে।
ধরুন, আপনার পাশ থেকে কেউ হঠাৎ তাকালেন। আপনি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন, তিনি কোন জিনিসের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। এই ক্ষমতা আমাদের এতই অভ্যস্ত যে, এর পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে আমরা ভাবি না। ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী শিরো কোশিমা বিভিন্ন প্রাইমেটের চোখের গঠন বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় চিহ্নিত করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, অন্যান্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় মানুষের চোখের সাদা অংশ অত্যন্ত দৃশ্যমান। তাঁর অনুমান ছিল, এই স্ক্লেরা ও কালো তারার মধ্যকার স্পষ্ট পার্থক্যের জন্যই আমরা সহজে আঁচ করতে পারি একজন মানুষ ঠিক কোথায় দেখছে। আমাদের চোখের অপেক্ষাকৃত লম্বাটে আকৃতি এই কাজকে আরও সরল করে তোলে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী মাইকেল তোমাসেলো এই ধারণার বিস্তার ঘটান। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যৌথ কাজ, পারস্পরিক মনোযোগ বোঝা এবং অন্যদের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর মতো সহযোগিতামূলক কাজে চোখের সাদা অংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই তত্ত্ব পরখ করতে বিজ্ঞানীরা একটি অভিনব পরীক্ষা চালান। পরীক্ষায় অংশ নেয় মানবশিশু, গরিলা ও শিম্পাঞ্জি। একজন গবেষক কখনো কেবল চোখ গোলিয়ে ছাদের দিকে তাকালেন, আবার কখনো চোখ বন্ধ রেখে কেবল মাথা উঁচু করলেন। ফলাফলটি ছিল বিস্ময়কর। মানবশিশুরা মূলত চোখের দিকটিই অনুসরণ করল। গবেষক যখন শুধু চোখ দিয়ে উপর দিকে তাকান, তখন তারা প্রায় তিন গুণ বেশিবার ছাদের দিকে তাকায়। পক্ষান্তরে, গরিলা ও শিম্পাঞ্জিরা চোখের বদলে মাথার নড়াচড়ার ওপর বেশি নির্ভর করেছিল। তারা বোঝার চেষ্টা করছিল মাথাটি কোন দিকে ঘুরেছে।
চোখের এই বিশেষ ক্ষমতা মানুষের জীবনে জন্মের শুরুতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেখা গেছে, জন্মের কয়েকদিনের মধ্যেই নবজাতক সেদিকেই বেশি সময় তাকায়, যেদিকে থেকে সরাসরি তার দিকে তাকানো হচ্ছে। দুই থেকে চার মাস বয়সে তারা অন্যের দৃষ্টির অভিমুখ অনুসরণ করতে শেখে এবং আট মাস নাগাদ এটি এক নিয়মিত আচরণে পরিণত হয়। এই সক্ষমতার অন্যতম বড় সুফল হলো ভাষা শেখা। যখন কোনো শিশুর সামনে একটি বলের দিকে তাকিয়ে বলা হয় 'এটা বল', তখন শিশুটি বক্তার দৃষ্টি অনুসরণ করেই বস্তুটি চিহ্নিত করে এবং ধীরে ধীরে তার নাম আয়ত্ত করে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যেসব শিশু অন্যের চোখের অভিমুখ বেশি অনুসরণ করে, তাদের শব্দভাণ্ডারও তুলনামূলকভাবে দ্রুত সমৃদ্ধ হয়।
তবে সমস্ত গবেষকই যে একমাত্র সাদা রঙকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করেন, এমনটি নয়। ইউনিভার্সিটি অব লাস পালমাস দে গ্রান কানারিয়ার গবেষক হুয়ান পেরেয়া-গার্সিয়া উল্লেখ করেছেন, আসলে রঙ নয়, বরং মণি ও স্ক্লেরার মধ্যবর্তী বৈপরীত্যটিই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক মানুষের স্ক্লেরায় প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা গাঢ় ভাব বিদ্যমান। পরবর্তী এক গবেষণায় শিম্পাঞ্জির চোখের ছবি ডিজিটালি বদলে স্ক্লেরা সাদা করে দেওয়া হয়, এবং তখন তাদের দৃষ্টির দিক বোঝা অনেক সহজ হয়ে যায়। অর্থাৎ, পুরো চোখের গঠনটিই এখানে প্রাসঙ্গিক।
চোখের এই সাদা অংশ স্বাস্থ্যের আভাসও বহন করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি হলদে বা লালচে হতে পারে। আকস্মিকভাবে স্ক্লেরা অতিরিক্ত হলুদ হয়ে গেলে জন্ডিসের ইঙ্গিত দিতে পারে, আর অস্বাভাবিক লালচে ভাব চোখের সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। যাদের স্ক্লেরা পরিষ্কার ও উজ্জ্বল, তারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও কম বয়সী বলে গণ্য হন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই আমরা বুঝে ফেলি তারা কী দেখছে। এই নিতান্ত স্বাভাবিক কাজের নেপথ্যে চোখের ক্ষুদ্র সাদা অংশ নীরবে আমাদের যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও অর্থপূর্ণ করে তুলছে।




