বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনে কয়েক মাস আগে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী ইস্পাতের তারের ফাঁদে আটকা পড়ে। সম্ভবত চিত্রা হরিণ বা বুনো শূকর ধরার উদ্দেশ্যে পাতা ওই ফাঁদে ধরা পড়ার পর দীর্ঘদিন মুক্ত হতে না পেরে প্রাণীটি মারাত্মক আহত, অপুষ্ট ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বন বিভাগ তাকে উদ্ধার করে এবং খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এই ঘটনা বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত। বন বিভাগের কর্মকর্তা, পশুচিকিৎসক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই বাঘিনীটি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে।
কিন্তু শারীরিক সুস্থতা অর্জনের পর এখন সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—একা বনে ফিরে সে আদৌ স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে পারবে কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘের মতো এলাকানির্ভর শিকারির ক্ষেত্রে প্রায় ছয় মাসের বন্দিত্ব ও অনুপস্থিতি তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। সুন্দরবনের প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের একটি নির্দিষ্ট বিচরণক্ষেত্র থাকে, যা শুধু ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং বহু বছরের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার জ্ঞানভান্ডার। জোয়ারের সময় কোন পথ নিরাপদ, কোন খালের ধারে হরিণ বেশি আসে, কোথায় প্রতিদ্বন্দ্বী বাঘের উপস্থিতি—এসব জ্ঞান কোনো মানচিত্রে লেখা থাকে না, বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ ও অসংখ্য শিকারের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়।
চিকিৎসাকালীন বন্দিত্বে প্রাণীটির জীবন রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য থাকে, ফলে তাকে খাবার খুঁজতে বা শিকার ধরতে হয় না। এটি চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য হলেও স্বাভাবিক শিকারি আচরণের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে। শিকার কেবল শক্তির খেলা নয়, এটি ধৈর্য, কৌশল, পর্যবেক্ষণ ও সঠিক মুহূর্তে আক্রমণের সমন্বয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় মাংসাশী প্রাণীদের অধিকাংশ শিকার-চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। এই দক্ষতা জন্মগত হলেও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শাণিত হয়, যা বন্দিত্বে থাকার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া দীর্ঘদিন মানুষের সংস্পর্শে থাকায় আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে এবং মানুষের প্রতি স্বাভাবিক সতর্কতা দুর্বল হয়ে গেলে ভবিষ্যতে মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আরও একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, যে এলাকা থেকে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তার অনুপস্থিতিতে সেটি এখনো তার নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা নিশ্চিত করে জানা যায় না। সেখানে অন্য কোনো বাঘ বিচরণ শুরু করে থাকলে, ফিরে গিয়ে পুরোনো এলাকা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে তাকে নতুন এলাকা খুঁজতে হবে অথবা প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে হবে। পূর্ণবয়স্ক বাঘের মধ্যে এ ধরনের সংঘর্ষ প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই অবমুক্ত করার আগে সম্ভাব্য আবাসস্থল ও বর্তমান টেরিটরির অবস্থা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
অনেক দেশে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে দুটি পৃথক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুনর্বাসনের উদ্দেশ্য হলো নিশ্চিত হওয়া যে প্রাণীটি স্বাধীনভাবে প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে পারবে কি না। এক্ষেত্রে প্রাণীটির শিকার করার ক্ষমতা, মানুষের উপস্থিতি এড়িয়ে চলা এবং প্রজাতিসুলভ স্বাভাবিক আচরণ মূল্যায়ন করা হয়। এসব দেশে হাসপাতাল থেকে সরাসরি বনে অবমুক্ত না করে প্রথমে প্রাকৃতিক পরিবেশের অনুরূপ একটি বড় ঘেরা এলাকায় রেখে ‘সফট রিলিজ’ বা ধাপে ধাপে অবমুক্তির মাধ্যমে প্রাণীটির দক্ষতা পুনরায় যাচাই করা হয়।
এই বাঘিনীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ, পশুচিকিৎসক, সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী, আচরণবিজ্ঞানী ও সুন্দরবনের অভিজ্ঞ মাঠকর্মীরা থাকবেন। তাদের সম্মিলিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত যে বাঘিনীটি অবিলম্বে বনে ফিরবে, আরও পুনর্বাসন প্রয়োজন, নাকি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এখনই একটি বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাতীয় পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ (ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট) প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে বন ব্যবস্থাপনা ও বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর উদ্ধার, পুনর্বাসন, মানব-বন্য প্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার মতো জটিল কাজ অনেক বেশি কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে পারে। বর্তমান বন বিভাগের বিকল্প নয়, বরং বিশেষায়িত অংশীদার হিসেবে কাজ করবে এমন একটি বিভাগ দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
তাই এই বাঘিনী কেবল একটি উদ্ধার হওয়া প্রাণী নয়, সে বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের একটি সন্ধিক্ষণের প্রতীক। যদি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে সে নিজের শক্তিতে সুন্দরবনে টিকে থাকতে পারবে, তবে তাকে তার জন্মভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়াই হবে সবচেয়ে নৈতিক সিদ্ধান্ত। আর যদি দেখা যায় আরও পুনর্বাসন ছাড়া অবমুক্তি তার নিজের, অন্য বাঘের কিংবা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তাহলে সেই বাস্তবতাও মেনে নিতে হবে। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব মানে সব সময় খাঁচা খোলা নয়; প্রকৃত দায়িত্ব হলো প্রাণীটির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ, প্রজাতির সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা।




