শিং মাছের কাঁটার আঘাতে যে তীব্র ব্যথা হয়, তার মূল কারণ হলো কাঁটার গোড়ায় অবস্থিত বিষ-উৎপাদনকারী কোষ। পেক্টোরাল ও ডরসাল ফিনের ভিত্তিতে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট থলিতে বিষ জমা থাকে। হুল ফোটানোর সময় থলি চাপ খেয়ে বিষ ক্ষতস্থানে প্রবেশ করে, ফলে সঙ্গে সঙ্গে তীব্র, প্রায় বৈদ্যুতিক শকের মতো ব্যথা শুরু হয়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে মানুষ তা সহ্য করতে পারে না, যদিও প্রাণঘাতী হওয়া অত্যন্ত বিরল।
মজার বিষয় হলো, এই বিষ তৈরির পেছনে কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থি নেই। মানুষের শরীরের মতো নালিপথযুক্ত গ্রন্থির পরিবর্তে শিং মাছের কাঁটার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোষগুলো বিষ তৈরি করে। এগুলো একত্রিত হয়ে একটি অগোছালো অঙ্গ তৈরি করলেও প্রকৃত বহুকোষী গ্রন্থির সাধারণ নির্গমনপথ নেই। বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প হলেও কার্যকারিতায় এটি অনন্য।
পোল্যান্ডের একটি টক্সিকোলজি সেন্টারে জমা হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কাঁটা ফোটার পর রোগীদের মধ্যে অসাড়তা, মাথা ঘোরা এবং ক্ষতস্থান ফুলে লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কারও কারও ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ নেমে যায়। একটি ছোট মাছের কাঁটা থেকে এত জটিল প্রতিক্রিয়া সম্ভব, যা ভাবলে অবাক হতে হয়।
গ্রামাঞ্চলে শিং মাছের কাঁটা ফোটার পর একটি প্রচলিত টোটকা হলো গরম পানিতে ক্ষতস্থান ডুবিয়ে রাখা। বিজ্ঞান এই লোকজ্ঞানের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। বিষের প্রোটিনগুলো তাপ পেলে ভেঙে যায় এবং তাদের কার্যকারিতা হারায়। তাই সহনীয় মাত্রার গরম পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখা সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা। এখানে লোকজ্ঞান ও গবেষণাগারের সিদ্ধান্ত মিলে যায়।
শিং মাছের আরেকটি আশ্চর্য ক্ষমতা হলো বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন নেওয়ার সামর্থ্য। পুকুর শুকিয়ে গেলে বা পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলেও শিং মাছ কাদার মধ্যে বেঁচে থাকে। বিষাক্ত কাঁটা ও বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে শিং মাছ একটি প্রায়-অবিনাশী প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। শিকারি এড়াতে বিষ আর প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় বাতাস—দুটো ভিন্ন সমস্যার সমাধান একই শরীরে।
চিকিৎসাশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও শিং মাছ কৌতূহলের বিষয়। অনেক স্থানে এই মাছকে ওষুধি গুণসম্পন্ন বলে মনে করা হয়, বিশেষ করে দুর্বল রোগী বা প্রসূতির পথ্য হিসেবে। অথচ যে মাছ শরীর সারায়, তার কাঁটায় লুকিয়ে আছে বিষ। এই দ্বৈততা—একদিকে পথ্য, অন্যদিকে বিপদ—বাংলাদেশের মাছবাজারের একটি বাস্তবতা।
মাছওয়ালারা তাই শিং মাছ ধরার সময় কাঁটাগুলো আগেই কেটে বা ভেঙে দেন, অথবা মোটা কাপড়ে জড়িয়ে রাখেন। ক্রেতার হাতে পৌঁছানোর আগেই বিপদ অনেকাংশে সরিয়ে ফেলা হয়। তবুও মাঝেমধ্যে সেই কাঁটা এড়িয়ে যায় সবকিছু—বাজারের ঝুড়িতে হাত ঢোকানোর সময়, রান্নাঘরে কুটতে গিয়ে, কিংবা পুকুরের কাদায় হাত ডোবানোর মুহূর্তে। তখনই সেই পুরোনো পোড়া অনুভূতি ফিরে আসে, যা লাখ লাখ মানুষের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা দিতে পারে, গরম পানির টোটকা প্রতিকার দিতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তের ব্যথা ও জ্বালা রয়ে যায় ঠিক আগের মতোই।




