বডিবিল্ডিং, হলিউড ও মার্কিন রাজনীতি—জীবনের তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অধ্যায়ে কিংবদন্তির মর্যাদা অর্জন করেছেন আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার। গতকাল ৭৯ বছরে পদার্পণ করা এই তারকা নিছক 'টার্মিনেটর' চরিত্রের অভিনেতা নন; তিনি নিরন্তর প্রয়াস, অপরিমেয় আত্মপ্রত্যয় এবং বারবার আত্মপুনর্গঠনের এক জীবন্ত প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আর্থিক দুরবস্থায় ১৯৪৭ সালের ৩০ জুলাই অস্ট্রিয়ার থাল শহরে জন্ম নেওয়া শোয়ার্জেনেগারের শৈশন ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। পুলিশ কর্মকর্তা বাবার কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড় হলেও মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই ভারোত্তোলন শুরু করে তিনি বিশ্বাস করতেন, দৈহিক গঠনই তাকে বৈশ্বিক পরিচিতি এনে দেবে।

নিজের অতীত নিয়ে তিনি অকপট। একই কঠোর পারিবারিক পরিমণ্ডলে তার ভাই মেইনহার্ড মানসিক অবসাদে ভেঙে পড়লেও আর্নল্ডের মনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জন্মায়। শোয়ার্জেনেগার জানিয়েছিলেন, 'যে বাস্তবতা আমার ভাইকে গ্রাস করেছে, সেটাই আমাকে দিয়েছে ইস্পাতকঠিন শক্তি। ১৮ বছর বয়সেই অস্ট্রিয়া ছেড়ে আমি চলে আসি। স্থির করি, আমার বাবা যে জীবন বেছে নিয়েছেন, আমি কখনো সেটা বেছে নেব না।' বিশ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে 'মিস্টার ইউনিভার্স' খেতাব অর্জন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সাতবার 'মিস্টার অলিম্পিয়া' জিতে বডিবিল্ডিংয়ের কিংবদন্তিতে পরিণত হন। সুবিশাল দেহ, নিখুঁত মাংসপেশি ও অপরিসীম আত্মবিশ্বাসের দৌলতে তিনি দ্রুত বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সমসাময়িক বডিবিল্ডিংয়ে এখনও তাঁর প্রভাব অম্লান।

বডিবিল্ডিংয়ে শীর্ষে পৌঁছনোর পর যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও হলিউডে তার প্রবেশপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। প্রযোজকদের আপত্তি ছিল, তাঁর উচ্চারণ অতিমাত্রায় পুরু, নাম দুরূহ এবং দেহ 'অতিরিক্ত বৃহদাকার'। অনেকে ভেবেছিলেন, তিনি কখনোই বড় অভিনেতা হয়ে উঠতে পারবেন না। কিন্তু শোয়ার্জেনেগার হাল ছাড়েননি; ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও অভিনয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ক্রমশ নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। ১৯৮৪ সালের 'দ্য টার্মিনেটর' ছবিটি সবকিছু পাল্টে দেয়। ছবিতে স্বল্পসংখ্যক সংলাপের মধ্যে তাঁর বলা 'আই উইল বি ব্যাক' বাক্যটি সিনেমা শতিহাসের এক অমর উক্তি হয়ে ওঠে। 'টার্মিনেটর ২: জাজমেন্ট ডে', 'প্রিডেটর', 'কমান্ডো', 'টোটাল রিকল', 'ট্রু লাইজ', 'কনান দ্য বারবারিয়ান' ও 'কিন্ডারগার্টেন কপ'-এর মতো ছবি তাকে একের পর এক শীর্ষস্থানীয় অ্যাকশন তারকার আসনে বসায়।

জনপ্রিয় ধারণা ভ্রান্ত যে তার সমুদয় সম্পদ শুধুই অভিনয়ের ফল। পেশাজীবনের গোড়াতেই তিনি রিয়েল স্টেট বিনিয়োগে জোর দেন। ফোর্বস-এর প্রতিবেদন মতে, এখন তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার। ব্যবসা, বই, ফিটনেস ও প্রযোজনা—বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকেই এই বিশাল অথবল গড়ে উঠেছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকদের ধারণা, চলচ্চিত্রে নামার আগেই কোটি পতিতে পরিণত হওয়ার ভিত গড়ে ফেলেছিলেন। ২০০৩ সালে এক নতুন অধ্যায়ে পা রেখে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচিত হন ও দ্বিতীয় মেয়াদেও ক্ষমতায় থাকেন। জনপ্রিয় নায়ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের প্রধান নির্বাহী হওয়ার এই যাত্রা তাকে স্বতন্ত্র এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। তার আমলে পরিবেশ, অবকাঠামো ও আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি কাড়ে।

ব্যক্তিজীবনেও বড় ঝড় দেখেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সাংবাদিক মারিয়া শ্রিভারকে বিয়ে করার পর চার সন্তানের জনক হন। কিন্তু ২০১১ সালের এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানা যায়, দীর্ঘকাল আগে গৃহকর্মীর সাথে তার অপর এক সন্তানের জন্ম হয়েছিল। ঘটনাটি প্রকাশিত হতেই দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরে এবং দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের অবসান ঘটে। জীবনের সবচেয়ে বড় বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত এই বিচ্ছেদের জন্য তিনি নিজ দায় স্বীকার করেছেন। তাঁর মন্তব্য, 'যদি বিচ্ছেদ সুন্দরভাবে সামলানোর জন্য কোনো পুরস্কার থাকতো, তাহলে আমি ও মারিয়া সেটি অবশ্যই জিততাম।' জন্মগত হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে একাধিকবার অস্ত্রোপচার করাতে হলেও, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন এখনও তার রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তরুণদের তিনি সমাজিক মাধ্যমেও সুস্থতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

শরীরের বার্ধক্যটি কঠোর বাস্তবতার সাথে মেনে নিয়েছেন, তবুও কাজ বন্ধ নেই। এখন প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অতীতের সেই শিল্পকর্ম যেন খুঁজে না পেলেও বাস্তবতা গ্রহণ করেছেন। নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘ফিউবার’ দিয়ে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি টেলিভিশন অভিনয়ে হাত দেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘নতুন কিছু শেখা ও অভিনয় জীবনের অঙ্গ। প্রত্যহ সাইকেল চালানো, ব্যায়াম, ছবি করা—সবই চলছে। জীবন থেকে জিনিস সরাচ্ছি না, বরং যোগ করছি। অবসর নেয়ার কোনো পরিকল্পনাই এখনও আমার মাঝে নেই।’