সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীর তৃগাংগারমুখ এলাকায় আগামী ২৮ আগস্ট একটি বার্ষিক নৌকা প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে এ আয়োজন চলে আসছে। এবারও প্রতিযোগিতার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারী নৌকাগুলোর জন্য শুক্রবার দুপুর ১২টার মধ্যে নাম নিবন্ধনের সময়সীমা নির্ধারণ করা আছে। প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি বড় আকারের গরু এবং দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি ছাগল উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এ নদীতে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে এলাকায় একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের লোকজনও এ আয়োজনে অংশ নিতে আসেন। পূর্বে কখনো এমন আয়োজনে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তাঁরা।

কিন্তু সম্প্রতি ‘লাউতা ইউনিয়ন তৌহিদি জনতা’ নামের একটি ব্যানারে কিছু ব্যক্তি এ প্রতিযোগিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির মাধ্যমে প্রচার চালানোর পাশাপাশি গত বৃহস্পতিবার বারইগ্রাম বাজার মসজিদে একটি সভা করেও তাঁরা একই দাবি তুলেছেন। সভার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, যেখানে তিনজন বক্তাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভিডিওতে একজন বক্তা বলেন, এ আয়োজনে নদীর পাড় ও আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায় এবং যানজট তৈরি হয়। রোগীদের চলাচলেও সমস্যা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। আরেকজন বক্তা দাবি করেন, নৌকাবাইচের নামে জুয়ার আসর বসানোর চেষ্টা হচ্ছে, যা যুবসমাজের নৈতিক ক্ষতি করবে। তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগে এ ধরনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে এক নারী নিহত হয়েছিলেন এবং মারামারি ও নৌকা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। কৃষকদের চারাগাছ নষ্ট হওয়া এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কাও তিনি তুলে ধরেন। বক্তাদের মতে, ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এমন আয়োজন চান না এবং স্বার্থান্বেষী একটি মহল এ আয়োজন সামনে এনে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়।

বিপরীতে আয়োজক কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম জানান, মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি প্রতিবাদ করছেন। তিনি বলেন, লাউতা ইউনিয়নের মুরব্বিরা উভয় পক্ষকে নিয়ে শনিবার বিকেলে একটি বৈঠক করবেন। তাঁর আশা, সবাই নৌকাবাইচ আয়োজনের পক্ষে রয়েছেন এবং যথাসময়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, বিষয়টি বড় কোনো সমস্যা নয় এবং এটি ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সম্প্রতি একজন ‘হুজুর’ বক্তব্য দিয়েছেন যে, গ্রামীণ এ আয়োজনে প্রায়ই মারামারি হয়; গত বছরও মারামারির কারণে প্রতিযোগিতা হয়নি। এ কারণে এক পক্ষ বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন, আর অন্য পক্ষ আয়োজনের পক্ষে রয়েছেন। ইউএনও আরও জানান, নৌকাবাইচের ফলে নদীর পাড় ও আবাদি জমির ক্ষতি হয় এবং প্রায় প্রতিবছরই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তিনি বিষয়টিকে স্থানীয় একটি ইস্যু হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের দায়িত্ব স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হোসেনকে দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ইউএনওর কার্যালয়ে শনিবার বেলা পাঁচটায় উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হবে। ইউএনও স্পষ্ট করেন, প্রশাসনিক অনুমতি নিয়েই আয়োজকদের নৌকাবাইচ করতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে কি না, তা বিবেচনা করে দেখা হবে। তিনি আরও জানান, এটি কোনো বড় সংকট নয় এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

এই প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিযোগিতাটি সিলেটের বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মধ্যবর্তী এলাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আয়োজক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অনুমতির শর্তে আয়োজন সম্পন্ন হতে পারে।