প্রায় সাত দিন ধরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আবাসিক হলগুলোতে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত রয়েছে। এর ফলে ডাইনিংয়ের কর্মীরা সিমেন্টের ব্লক দিয়ে তৈরি অস্থায়ী চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে খাবার প্রস্তুত করছেন। পুরো রান্নাঘর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে, আর বৃষ্টির সময় আগুন নিভে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন খাবার ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি আবাসিক হলের মধ্যে ছয়টি ছাত্রদের এবং তিনটি ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত। প্রতিটি হলে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারশ শিক্ষার্থীর জন্য খাবার রান্না হয়। গ্যাসের অভাবে এখন পছন্দমতো বিভিন্ন পদ প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে না; সীমিত কয়েকটি আইটেমেই রান্না সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। হলভিত্তিক খাবার তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন, নির্ধারিত সময়ে শত শত শিক্ষার্থীর খাবার তৈরি করতে গিয়ে পরিকল্পনা বারবার ভেস্তে যাচ্ছে।
শহীদ মোহাম্মদ শাহ হলের ডাইনিং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা শিক্ষার্থী তাহমিদ সুপ্তের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ হ্রাসের কারণে প্রতিদিনের রান্নার সময়সূচি এলোমেলো হয়ে পড়েছে। লাকড়ির চুলায় রান্না করতে গিয়ে সময় ও শ্রম—উভয়ই কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পূর্বের মতো বৈচিত্র্যময় মেনু ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ছাত্রীদের তাপসী রাবেয়া হলের ডাইনিং ব্যবস্থাপক সুনেহরা সুবাহ জানান, প্রচণ্ড গরম, ঘন ধোঁয়া ও আকস্মিক বৃষ্টির মধ্যে নারী কর্মীদের কাজ করতে হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের কারণে লাকড়ি ভিজে গেলে রান্নার সময় আরও দীর্ঘায়িত হয়। এর পরিণতিতে নির্ধারিত সময়ে খাবার পরিবেশন করা সম্ভব হয় না, যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী খাবার না খেয়েই পরীক্ষা বা ক্লাসে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তিনি জোর দিয়ে বলেন।
একই হলের পুরকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত খানম বলেন, রান্নার সময় হলের চারপাশে গরম ও ধোঁয়াময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় কক্ষে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্বল্প সময়ের জন্য পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আরও কম কষ্টকর ও কার্যকর রান্না পদ্ধতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে ডাইনিংয়ের বাবুর্চি ও সহযোগী কর্মচারীদের ওপর। শহীদ আবু সাঈদ হলের বাবুর্চি মো. আলমগীরের মতে, লাকড়ি দিয়ে এত বেশি মানুষের জন্য প্রতিদিন রান্না করা সম্ভব নয়। এক-দুই দিন এভাবে চালানো গেলেও নিয়মিত এই পদ্ধতিতে কাজ করলে কষ্ট কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলে তিনি জানান।
শুধু আবাসিক হল নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনগুলোতেও গ্যাসের অভাবে রান্না ব্যাহত হচ্ছে। শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে আসা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাফেটেরিয়া ও হলের ক্যানটিন খাবারের প্রধান ভরসা। শহীদ মোহাম্মদ শাহ হলের ক্যানটিনের ইজারাদার সজীব জানান, গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে হচ্ছে, যার ফলে ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায়ও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মোসাম্মাত রোকসানা খাতুন বলেন, দিনভর গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। এই অবস্থা আর কতদিন চলবে তা অনিশ্চিত; দ্রুত সমস্যার সমাধান হওয়া জরুরি বলে তিনি মত দেন।
এই সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী ও পুরকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তারেকুল আলম প্রথম আলোকে জানান, মাতারবাড়ি থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এ কারণে সারা দেশে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ওই সরবরাহ লাইনের সমস্যা দূর হলে চুয়েটেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।




