জার্মানির স্টুটগার্ট থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে লেক কনস্ট্যান্সের তীরবর্তী বন্দরনগরী লিনডাউতে পৌঁছে লেখক ও তার পরিবার এক ভিন্ন জগতের সন্ধান পান। আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই হ্রদটি জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার সীমান্তে বিস্তৃত। ৫৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল এই জলরাশি ইউরোপের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক নিদর্শন। আল্পসের বরফগলা পানি বয়ে নিয়ে আসা রাইন নদী এই হ্রদে মিলিত হয় এবং পরে এর পশ্চিম সীমা থেকে বেরিয়ে সৃষ্টি করে ইউরোপের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত, রাইনে ফলস।
লিনডাউয়ের বন্দর থেকে এক বিকেলে তারা পর্যটন জাহাজে করে অস্ট্রিয়ার দিকে রওনা দেন। গন্তব্য ছিল মনোরম বন্দরনগরী ব্রেগেন্। কিন্ত প্রকৃতি তাদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা সাজিয়ে রেখেছিল। জাহাজে ওঠার কিছু সময়ের মধ্যেই আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়। আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায় এবং প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় বৃষ্টি। শান্ত লেক মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ওঠে। বিশাল বিশাল ঢেউ জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়তে থাকে, ডেক ভিজে যায় বৃষ্টির পানিতে। এর মাঝখান দিয়েই আল্পস পর্বতের পাদদেশে ব্রেগেন্জ বন্দরের তারা নেমে পড়েন। শীত ও বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ওভারকোট দিয়ে নিজেদের আবৃত করে রাখায় তারা খুব বেশি বিপদে পড়েননি। ব্রেগেন্জের সি-প্রমেনাড ধরে হাঁটার ইচ্ছা থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার জন্য তা আর হয়ে ওঠেনি।
ভিজতে ভিজতে তারা আশ্রয় নেন লেকের তীরের এক রেস্তোরাঁয়। রেস্তোরাঁর কাচের বড় জানালা দিয়ে তখন চোখে পড়ছিল অপূর্ব এক দৃশ্য। বৃষ্টির ফোটার আঘাতে ঝাপসা লেক কনস্ট্যান্স, বন্দরে বাধা পালতোলা নৌকাগুলো, দূরের মেঘে ঢাকা আল্পসের অস্পত রেখা এবং বাতাসে দোল খাওয়া গাছগুলো— সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল এক জীবন্ত জলরঙ ছবি। সেই পরিবেশে তারা স্বাদ নেন অস্ট্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারের। সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ভোরালবার্গ অদনের ঐতিহ্যশালী বিয়ার, যার স্বাদ বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
বৃষ্টি কিছুটা থামলে তারা দ্রুত টার্মিনালে ফিরে আসেন। কিন্তু লেক কনস্ট্যান্সের উপর দুর্যোগ চলমান থাকায় নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর জাহাজ লিনডাউয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ফেরার পথটিও ছিল সমান উত্তাল। প্রবল বাতাসে তৈরি হওয়া ঢেউয়ের কারণে জাহাজটি দুলছিল, তবে প্রকৃতির এই রুদ্র রূপও এক অপার সৌন্দর্য ধারণ করেছিল। এক ভ্রমণপিপাসু অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সঙ্গে জাহাজের ছাদে গল্পে সময় কাটে। লিনডাউ ফিরে আসার পর বৃষ্টি থামে।
প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফেরার পথে গাড়ির ভেতরের পরিবেশ ছিল একদম আলাদা। বাইরে ব্ল্যাক ফরেস্টের ঘন জঙ্গল, বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ও শরতের রং। ভেতরে তাদের আড়াই মাসের ছোট্ট মেয়ে রূপকথা তার কার সিটে গাড়ির দুলুনিতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল। তার মা তুলতুল ও বাবা অনিত বারবার খেয়াল রাখছিলেন সন্তানের আরামের। রূপকথার সেই শান্ত নিশ্বাস, বাইরের প্রকৃতির সৌন্দর্যের সাথে মিশে গাড়ির ভেতর এক প্রশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল। একদিন হয়তো তার এসব স্মৃতি থাকবে না, কিন্তু পরিবারের সাথে কাটানো এই নিরাপদ ও স্নেহময় ভ্রমণের উয়তা তার মনে গভীর ছাপ ফেলে যাবে।




