দই বানানোর প্রক্রিয়াটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ: গরম দুধে সামান্য পুরোনো দই মিশিয়ে রাখলেই তা জমে যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—প্রথম দইটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, যখন কোনো দই ছিল না? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কারটি সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাবশত ঘটে। হাজার হাজার বছর আগে, মানুষ পশুর চামড়ার থলিতে দুধ সংরক্ষণ করত। সেই চামড়া থেকে প্রাকৃতিকভাবে উপকারী ব্যাকটেরিয়া দুধে মিশে যেত, যা দুধকে জমাট বেঁধে টক ও ঘন দইয়ে পরিণত করত। প্রাচীনকালের মানুষ ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে কিছুই জানত না, কিন্তু তারা লক্ষ্য করেছিল যে পশুর চামড়ার থলিতে দুধ রাখলে তা জমে যায়। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে, পুরোনো দই নতুন দুধে মিশিয়ে দিলেও একই ফল পাওয়া যায়। এভাবেই দই থেকে দই তৈরির পদ্ধতির সূচনা হয়।

দইয়ের ইতিহাস লিখিত ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন। আনাতোলিয়ার ছাগলপালকেরা ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার থলিতে দুধ জমিয়ে রাখতে গিয়েই প্রথম দই আবিষ্কার করে বলে ধারণা করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদশাস্ত্রেও দুধ জমাট বেঁধে তৈরি খাবারের উপকারিতার উল্লেখ রয়েছে। 'ইয়োগার্ট' শব্দটির উৎপত্তি তুর্কি শব্দ 'ইয়োগ' থেকে, যার অর্থ কোনো তরলকে ঘন বা জমাট করা। ১৬২৫ সালে ভ্রমণলেখক স্যামুয়েল পার্চাস প্রথম ইংরেজি ভাষায় এই শব্দের উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি তুর্কিদের 'ইয়োগার্ড' নামক টক ও ঘন দুধ খাওয়ার কথা লেখেন। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান দার্শনিক প্লিনি দ্য এল্ডারও কিছু বর্বর জাতির দুধ জমিয়ে টক খাবার তৈরির ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেন।

মঙ্গোল সাম্রাজ্যের শাসক চেঙ্গিস খান তাঁর সৈন্যদের নিয়মিত দই খাওয়াতেন, কারণ এটি তাদের শক্তিশালী ও সাহসী করে তুলত বলে বিশ্বাস ছিল। ১৫৪২ সালে ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়া পেটের সমস্যায় ভুগে তুর্কি চিকিৎসকের পরামর্শে দই খেয়ে সুস্থ হন এবং এরপর পশ্চিম ইউরোপে দইয়ের প্রচলন শুরু করেন। পরবর্তীতে মানুষ দইয়ের সঙ্গে মধু, ফল ও দারুচিনি মিশিয়ে মিষ্টি হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।

বিংশ শতাব্দীতে বুলগেরিয়ার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র স্টামেন গ্রিগভ প্রথম আবিষ্কার করেন যে দই জমানোর পেছনে 'ল্যাকটোব্যাসিলাস বুলগারিকাস' নামক ব্যাকটেরিয়া কাজ করে। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এলি মেচনিকফ প্রমাণ করেন যে বুলগেরিয়ার কৃষকদের দীর্ঘায়ুর রহস্য এই দই। ব্যাকটেরিয়াগুলো দুধে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা দইকে টক স্বাদ দেয় এবং শরীরের ক্ষতিকর উপাদান দূর করে। এই আবিষ্কারের পর পশ্চিমা দেশগুলোতে ফার্মেসিতে ওষুধ হিসেবে দই বিক্রি শুরু হয়। ১৯১৯ সালে আইজ্যাক ক্যারাসো দইয়ের সঙ্গে জ্যাম ও ফলের রস মিশিয়ে বাজারে আনার উদ্যোগ নেন। তাঁর ছেলে ড্যানিয়েল ১৯৩২ সালে ফ্রান্সে 'ড্যানোন' (Danone) নামে বিশ্ববিখ্যাত দই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এর চার দশক পর জোসেফ ও এডগার ডিকিনসন ব্রিটেনে 'লংলি ফার্ম' দই তৈরি শুরু করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

বর্তমানে খাঁটি দই তৈরিতে 'ল্যাকটোব্যাসিলাস' ও 'স্ট্রেপ্টোকোকাস' ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়। দুধকে দীর্ঘ সময় জমাট বাঁধতে দিলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দুধের চিনি ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা দইকে প্রাকৃতিক টক স্বাদ ও ঘন গঠন দেয়। তবে সুপারমার্কেটের প্রক্রিয়াজাত দইয়ে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় না, বরং স্বাদ ও টেক্সচার বজায় রাখতে রাসায়নিক উপাদান, স্টেবিলাইজার ও মিষ্টি মেশানো হয়। বাড়িতে দই বানাতে ভালো মানের দুধ এবং হাজার বছরের পুরোনো ব্যাকটেরিয়ার সঠিক ব্যবহারই যথেষ্ট।