সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, পরিবারের একমাত্র সন্তান সাধারণত একটু বেশিই আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হয়। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি কি এমনই? শিশু কতটা সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করে মূলত মা-বাবা এবং আশপাশের পরিবেশের ওপর। শৈশবেই একজন মানুষের চরিত্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে। বাড়িতে ভাইবোন না থাকার অর্থ হচ্ছে, কোনো জিনিস ভাগাভাগি করে নেওয়ার বা অপরের প্রতি সহনশীল হওয়ার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই কম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ভাইবোন না থাকলেই একটি শিশু স্বার্থপর হয়ে উঠবে। বরং ভাইবোন থাকলেও অনেক সময় শিশুর মাঝে হিংসা বা স্বার্থপরতা দেখা দিতে পারে।

শিশু কতটা মানবিক হবে, তা তার মা-বাবার উৎসাহ ও চারপাশের পরিবেশ কীভাবে তাকে গড়ে তুলছে, তার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। এ সম্পর্কে কথা বলেছেন শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ। একমাত্র সন্তান হলে মামাতো, ফুফুতো, খালাতো বা চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। আপন ভাইবোন না থাকলেও এ ধরনের আত্মীয়তার সম্পর্ক সখ্য গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়। কাছাকাছি থাকার সুযোগ থাকলে ভালো। আর দূরত্ব থাকলেও যদি পারিবারিকভাবে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় থাকে, তাহলে শিশু অন্যের সঙ্গে মিশতে শেখে। একইভাবে প্রতিবেশী শিশু, খেলার সাথী, বা সহপাঠীর সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমেও একটি শিশুর সামাজিক দক্ষতা বিকশিত হয়। এভাবে শৈশব থেকেই সে ভাগাভাগির শিক্ষা লাভ করে।
শিশু যখন অন্যের সাথে মিশতে শুরু করে, তখন তার মনে অপরের জন্য ভাবনার সৃষ্টি হয়। যেমন খেলার সঙ্গীর অসুস্থতায় তারও মন খারাপ হতে পারে বা সহপাঠীকে শিক্ষক বকা দিলে তার জন্য মায়া জন্মাতে পারে। একটি শিশু অন্যের জন্য কতটা ভাববে, তার মূল ভিত্তি তার ভাইবোনের সংখ্যা নয়, বরং অভিভাবক তার মধ্যে সহমর্মিতার কতটা শিক্ষা দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, অভিভাবক যদি শিশুকে নিজের খাবার বা খেলনা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে উৎসাহিত করেন, তাহলে শিশু ভাগ করে নেওয়া শিখতে পারে। রাস্তার ক্ষুধার্ত কোনো প্রাণীকে খাবার দিতে বলা হলে বা কারও কষ্টের সময় পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিলে সে সহমর্মী হয়ে ওঠে। বয়স ও বোঝার সক্ষমতা অনুযায়ী এভাবে গড়ে উঠলে শিশু মানবিক হবে, ভাইবোন না থাকলেও।
সন্তান আত্মকেন্দ্রিক হবে নাকি মিশুক হবে, এটি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে মা-বাবার সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতার ওপর। ভাইবোন না থাকার কারণে একমাত্র সন্তানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠার ভালো সুযোগ থাকে। যেমন ছুটির দিনে কোথায় যাওয়া হবে, সেটা তাকেই বেছে নিতে দেওয়া। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে নিতে সে আত্মবিশ্বাসী হয়। এই আত্মবিশ্বাস আত্মকেন্দ্রিকতা নয়, বরং তার স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়। তবু স্বার্থপরতার প্রশ্নটি ওঠে কেন? কারণ একমাত্র সন্তানটি বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত সবকিছু একা পায়। অতিরিক্ত আদর, অতিরিক্ত নিরাপত্তা বোধ বা অল্প বয়স থেকেই অপরের সাথে মেশার পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়া আত্মকেন্দ্রিকতার কারণ হতে পারে। তাই সাধারণভাবে মনে হয়, একমাত্র সন্তান হয়তো স্বার্থপর।

একটু বেশি যত্নে রাখতে গিয়ে অভিভাবক একমাত্র সন্তানকে অনেক সময় স্বাভাবিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করেন। যেমন, সবাই পিকনিকে গেলেও সে অনুমতি না পাওয়ার ফলে ব্যক্তিগত জীবনে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। ফলে পরিবারের প্রতি তার অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গড়ে উঠতে পারে। বন্ধুর বিপদে ছুটে যাওয়ার মতো স্বাধীনতা সীমিত হলে সে স্বার্থপর তকমা পেতে পারে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার কারণে বন্ধুমহলে সে নেতৃত্ব দিলেও অন্যদের কাছে তা শুধু নিজের মতো করে ভাবার পরিচয় বলে মনে হতে পারে। দাম্পত্য জীবনেও ছোটখাটো বিষয়ে অসুবিধা হতে পারে। কারণ তার ব্যক্তিগত পরিসরে কখনো কেউ প্রবেশ করেনি, ফলে নতুন পরিবারে মানিয়ে নেওয়া বা সঙ্গীর মতামত মেনে নেওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে। বড় হওয়ার পর এটাও স্পষ্ট হয় যে, মা-বাবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাকে একাই সামলাতে হবে। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের বন্ধু বা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের অনেক আবদারে সাড়া দেওয়া সম্ভব হয় না, যা অন্যের চোখে স্বার্থপরতা মনে হতে পারে। বিয়ের পরও নিজের মা-বাবার ঘন ঘন খোঁজ নেওয়া বা তাদের কাছে যাওয়াটাও অনেকে সহজভাবে নিতে পারেন না।

ভাইবোন থাকা বা না থাকার মধ্যে কিছু পার্থক্য নিশ্চিত আছে, কিন্তু এটিকে আত্মকেন্দ্রিকতার মাপকাঠি হিসেবে ধরা ঠিক নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরিশীলিতভাবে বেড়ে ওঠা যে কোনো মানুষই চমৎকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারেন।