কর্মস্থলে পেশাদার আচরণ, মৌলিক দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি বাংলাদেশের বেসরকারি চাকুরির বাজারে একটি নীরব সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী সময়ানুবর্তিতা, কাজের সরঞ্জামের যত্ন নেওয়া ও নিজের দায়িত্ব গ্রহণের মতো প্রাথমিক শৃঙ্খলাতেও পিছিয়ে। অর্থাৎ কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেই একজন কর্মীকে পেশাদার বলা যাচ্ছে না।
চাকরির খোঁজার সময়েও অদক্ষতার চিত্র স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, ৩৬ শতাংশ চাকরিপ্রত্যাশী আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সহায়তায় কাজ খোঁজেন। সংবাদপত্রের সাহায্য নেন ২৬ শতাংশ, অথচ সরাসরি প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেন মাত্র ১২ শতাংশ। চাকরির বাজারে তাই দক্ষতার চেয়ে পরিচিতির খাতাটিই অনেক বেশি ভারী থাকে। এই প্রবণতা চাকুরে ঢোকার পর অনেকের ক্ষেত্রেই তোষামোদে রূপ নেয়। বস কী শুনতে চান তা বুেঝে চলা এবং সম্পর্কের ওপর ভরসা করাটা কাজের জটিল মুহুর্তে দক্ষতার অভাবকে ঢেকে দেয় না। সংকটের সময় প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত সেটিকেই গুরুত্ব দেয় যে কাজটি কে করতে পারেন।
তবে সংকট কেবল দক্ষতাহীন কর্মীর জন্য নয়। বিবিএস-এর ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ। ডিগ্রি ও পরিচিতি থাকার পরও কর্মসংস্থানের নিশ্চিতি কম। অন্যদিকে, সৎ ও দক্ষ কর্মী ধরে রাখার ক্ষেত্রেও হিসাবটা জটিল। একজন দক্ষ কর্মী যখন নিজের কাজের যথার্থ মূল্য বুঝতে পেরে বেতন বৃদ্ধির দাবি তোলেন, তখন প্রায়ই মালিকপক্ষ ‘বাজার খারাপ’ দেখিয়ে পিছু হটে। নাম না প্রকাশ করা এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘কাজ ভালো করলে দায়িত্ব বাড়ে, কিন্তু তার সঙ্গে বেতন সমানতালে বাড়ে না।’
এর ফলে অদক্ষ কর্মী যেমন বোঝা, তেমনি অবমূল্যায়িত দক্ষ কর্মীও একসময় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। কেউ প্রতিষ্ঠান ছাড়েন, কেউ ন্যূনতম কাজ করে যেতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটি প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হয়। ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে ‘হোয়াট ডাজ জব সিকিউরিটি ইভেন লুক লাইক ইন ২০২৬? ইট স্টার্টস উইথ স্কিলস’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও লাগাতার ছাঁটাইয়ের এই যুগে শুধু তদবির বা চাটুকারিতা দিয়ে চাকরির নিশ্চয়তা বজায় রাখা অসম্ভব। প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো ক্ষেত্রেও কাজে লাগে এমন স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা যেমন, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, যোগাযোগ দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকা জরুরি হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, কর্মীর দক্ষতা যতটা জরুরি, তেমনি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতাও কম নয়। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও দক্ষ কর্মীর স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। আত্মীয়ের সুপারিশে বা তোষামোদে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মূলমন্ত্র কাজের জোর। ২০২৬ সালের কর্মক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কেবল দক্ষ কর্মী খুঁজে পাওয়া নয়, বরং তাদের দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখা।




