চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহন প্রতিযোগিতায় চার বছর ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টার্মিনালটির মাধ্যমে মোট ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ (২০ ফুট সমতুল্য একক) কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) পরিবহন কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৩৬ হাজার টিইইউ, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ কম। ফলে জিসিবি দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছে।
এক সময় দেশের সবচেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন হতো জিসিবি দিয়ে। ১৯৫৪ ও ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া এই সুবিধার ১২টি জেটির মধ্যে ৬টিতে কনটেইনার এবং বাকি ৬টিতে সাধারণ পণ্য ওঠানো-নামানো হয়। ১৯৭৭ সালে এখান থেকেই দেশে কনটেইনার পরিবহন যাত্রা শুরু হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত শীর্ষে থাকা জিসিবি এরপর ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এনসিটি জিসিবিকে ছাড়িয়ে যায় এবং এরপর দুই টার্মিনালের মধ্যে পালাবদল চলতে থাকে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর ধরে শীর্ষে রয়েছে এনসিটি।
এনসিটির চারটি জেটি পুরোদমে চালু হওয়া এবং আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজনের ফলে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে টার্মিনালটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। এর আগে এটি পরিচালনা করেছিল সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। বর্তমানে টার্মিনালটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
জিসিবিতে কনটেইনার পরিবহন কমার কারণ সম্পর্কে বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে জাহাজ বরাদ্দ কম থাকায় এই পতন ঘটেছে। তবে ছয়টি জেটির প্রতিটি বার্থ অপারেটরের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এবং জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করেই তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।
তৃতীয় স্থানে থাকা চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালেও (সিসিটি) পরিবহন কমেছে ২১ শতাংশ। দুই জেটির এই টার্মিনালটি পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ারটেক। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন জানান, সিসিটির গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে, যার ফলে পরিবহন হ্রাস পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, চিটাগং ড্রাই ডকের অধীনে সাইফ পাওয়ারটেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ই-ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এনসিটিতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে, কারণ সেখানে প্রতি জেটিতে তিনটি করে গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের (আরএসজিটি) পরিবহন দ্রুত বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় ২২ বছরের জন্য পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া আরএসজিটি ২০২৪ সালের জুনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখানে প্রায় ৭৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিবহন হয়েছিল, যা শেষ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার টিইইউতে—অর্থাৎ এক বছরে ২৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি। টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় পাঁচ লাখ টিইইউ। বর্তমানে সেখানে জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করা হলেও নতুন গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয়েছে। আরএসজিটি বাংলাদেশের হেড অব কমার্শিয়াল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স সৈয়দ আরেফ সারোয়ার জানান, আগস্টের মাঝামাঝি নতুন ক্রেন চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে পাঁচ লাখ টিইইউ পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাইরে মোংলা বন্দরেও কনটেইনার পরিবহন বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেখানে ২৯ হাজার ৭৫১ টিইইউ কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। তবে দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনে মোংলার অংশ মাত্র ১ শতাংশ।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক মনে করেন, টার্মিনালগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে ব্যবহারকারীদের প্রকৃত সুফল পেতে নির্দিষ্ট একক মাশুলের পরিবর্তে মাশুলের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এতে অপারেটররা চাইলে কম খরচে উন্নত সেবা দিতে পারবে, যা প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং ব্যবহারকারীরা উপকৃত হবে।




