যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামো বর্তমানে একটি জটিল চিত্র উপস্থাপন করছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে একে অপরের থেকে পৃথক এবং কখনও কখনও পরস্পরবিরোধী আইন প্রণীত হচ্ছে, অথচ কোনো কেন্দ্রীয় ফেডারেল কাঠামো এখনও গঠিত হয়নি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি ‘ফেডারেল ফ্লোর, স্টেট সিলিং’ মডেলের কথা সামনে আনা হয়েছে। ধারণাটি হলো, কংগ্রেস সারা দেশের জন্য ন্যূনতম কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা (ফেডারেল ফ্লোর) নির্ধারণ করবে, আর রাজ্যগুলো সেই ভিত্তির ওপর আরও কঠোর নিয়ম আরোপ করতে পারবে, তবে একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা (স্টেট সিলিং) পর্যন্ত। ভোক্তা সুরক্ষা, শ্রম ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইনে এ ধরনের কাঠামো দেখা যায়। এর মাধ্যমে রাজ্যগুলোকে নমনীয়তা দেওয়ার পাশাপাশি একটি জাতীয় ন্যূনতম মান নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।

তবে এই মডেল বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য ফেডারেল ফ্লোর নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে, কারণ ন্যূনতম কী হওয়া উচিত তা নিয়ে গভীর মতভেদ দেখা দেবে। অন্যদিকে, রাজ্যগুলো ফ্লোরের ওপরে এত বেশি নিয়ম জারি করতে পারে যে তা যুক্তিসঙ্গত সিলিংয়ের বাইরে চলে যেতে পারে। এছাড়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে করা হয় যে ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পূর্ণরূপে ফেডারেল আইনের আওতায় রাখা উচিত, যেখানে রাজ্যগুলোর কোনো স্বাধীনতা থাকবে না। এর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় যে এসব মডেল এতটাই অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করে যে কেবলমাত্র কঠোর ফেডারেল আইনই যথেষ্ট হতে পারে, কোনো ফ্লোর বা সিলিং পদ্ধতি কাজ করবে না।

কেবল ফ্লোর ও সিলিং নয়, বরং আরও কিছু বিকল্প প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। একটি প্রস্তাব হলো, ফেডারেল আইন এআই সম্পর্কে বিস্তৃত জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, আর রাজ্যগুলো নিজেদের আইন সেভাবে সাজাবে। তবে এই পদ্ধতিতে রাজ্যগুলো জাতীয় লক্ষ্য মেনে চলবে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন। অন্যপ্রস্তাবে বলা হয়েছে, কংগ্রেস এআই আইনের জন্য আদর্শ টেমপ্লেট তৈরি করতে পারে, যা রাজ্যগুলো গ্রহণ করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে রাজ্যগুলো তাদের বিদ্যমান আইনগুলোকে সেই টেমপ্লেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে, যাতে সব রাজ্যের আইন তুলনামূলকভাবে একই রকম হয়। এই সমন্বয় (হারমোনাইজেশন) পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি হলো, ফ্লোর ও সিলিং মডেলেও রাজ্যগুলোর আইনে যথেষ্ট বৈচিত্র্য থেকে যাবে, যা এআই নির্মাতাদের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করবে। বর্তমানে তাদের ৫০টি রাজ্যের জন্য আলাদাভাবে মানদণ্ড পূরণ করতে হয়, যা ফ্লোর-সিলিং মডেল খুব একটা সহজ করে না।

সবচেয়ে বিতর্কিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো জাতীয় নিরাপদ আশ্রয় (ন্যাশনাল সেফ হার্বার) তৈরি করা। এই ধারণা অনুযায়ী, কোনো এআই নির্মাতা যদি ফেডারেল ফ্লোর মেনে চলে, তবে তাকে রাজ্যগুলোর ফ্লোর-উর্ধ্ব আইন থেকে সুরক্ষা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, রাজ্যগুলো এআই নিয়ন্ত্রণ করলেও, নির্মাতাদের ওপরের স্তরের রাজ্য আইন মেনে চলার প্রয়োজন হবে না। রাজ্যগুলো অবশ্য এতে তীব্র আপত্তি জানাতে পারে, কারণ তাদের কাছে এটি মেনে নেওয়া কঠিন হবে যে কেবল ন্যূনতম মান পূরণ করলেই নির্মাতারা দায়মুক্তি পাবে।

এই জটিলতা নিরসনে একাধিক স্তরবিশিষ্ট একটি সামগ্রিক পদ্ধতির কথাও ভাবা হচ্ছে। যেমন, ফেডারেল ও রাজ্য পর্যায়ের আইনপ্রণেতা, এআই বিজ্ঞানী ও নীতি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্থায়ী ফেডারেল-রাজ্য এআই গভর্ন্যান্স কাউন্সিল গঠন করা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এআই আইনের এই ধাঁধা সমাধানের জন্য সব পক্ষের দৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন। কিউব ধাঁধার উদ্ভাবক আর্নো রুবিক যেমন বলেছিলেন, "আপনি যদি কৌতূহলী হন, তাহলে আপনার চারপাশের ধাঁধাগুলো খুঁজে পাবেন। আপনি যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, তাহলে সেগুলো সমাধান করবেন।" এআই আইনের এই ধাঁধা সমাধানের পথে অনেক বাধা থাকলেও, এটি অসম্ভব নয়।