বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম ও বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম মাছরাঙা প্রজাতির একটি ছানার সন্ধান মিলেছে মৌলভীবাজারের আদমপুর এলাকায়। দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে সেই বিরল মুহূর্তটি ক্যামেরায় ধারণ করেছেন পাখি ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান।

২০২২ সালের ২৬ আগস্ট আদমপুরের গহিন বনের একটি ছড়ার ধারে প্রথমবারের মতো দেখা মেলে পাখিটির। কিন্তু ২০২৪ সালে কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেই সময় তোলা সব ছবি ও ভিডিও হারিয়ে যায়। এরপর গত বছর পাখিটির নতুন সন্ধান শুরু করেন তিনি। জানা যায়, পাখিটি আদমপুরে না এলেও জুড়ীর পাথারিয়া পাহাড় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুর্গম লাঠিটিলায় এসেছে। তবে বৃষ্টির কারণে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি তার পক্ষে।

গত মে মাসে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারীখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে পাখিটির উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন পক্ষী আলোকচিত্রী সেখানে ভিড় জমান। পড়াশোনার চাপ এবং মানুষের ভিড়ের কারণে সেবারও সফর স্থগিত রাখতে হয়। এরপর জুনের মাঝামাঝি সময়ে আদমপুরে আবারও পাখিটির দেখা পান দুইজন পরিচিত আলোকচিত্রী।

পরবর্তীতে 'বার্ডিংবিডি ট্যুরস' আয়োজিত একটি ডে ট্রিপে অংশ নিয়ে ১৮ মে রাতে পাঁচ সদস্যের একটি দল শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দেয়। সকালে পৌঁছে নাশতা সেরে অটোরিকশায় করে কাউয়ার গলায় পৌঁছান তারা। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষমাণ ছিলেন স্থানীয় গাইড লতিফ। সকাল নয়টায় শুরু হয় অভিযান। দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আগেরবার পাখিটির দেখা পাওয়া স্থানে পৌঁছান তারা।

লালমাথা ট্রোগনের ট্রেইল ধরে এগোতে থাকলে অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি পথ পার হয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে একটি ঝোপের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক পাখিটির দেখা মেলে। তবে পাতার আড়ালে থাকায় দলের বেশিরভাগ সদস্যই ছবি তুলতে ব্যর্থ হন। হঠাৎ পাখিটি উড়ে গেলে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন তারা। এরপর ছড়ার মুখে পৌঁছে তিন দিকে বিভক্ত এলাকা পরীক্ষা করেও কোনো সন্ধান পাননি। গাইডের পরামর্শে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আরেকটি সম্ভাব্য স্থানে গিয়েও ব্যর্থ হন।

ফিরতি পথে একসঙ্গে তিনটি পাখি দেখা গেলেও দ্রুত উড়ে যাওয়ায় ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ক্লান্ত দলটি বিশ্রাম নিতে বসে। ঠিক সেই সময় গাইড লতিফ সামনের ঝোপের লতানো গাছের ডালে ছোট্ট বেগুনি-কমলা রঙের পাখিটিকে দেখতে পান। মাত্র ২৬ সেকেন্ডের মধ্যে ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে সেই মুহূর্ত। কমলা-হলদেটে ঠোঁট দেখে বোঝা যায় এটি প্রাপ্তবয়স্ক নয়, বরং ছানা। প্রাপ্তবয়স্ক পাখিদের ঠোঁট প্রবালের মতো লাল হয়ে থাকে। পরবর্তী ১৩ মিনিটে ১৭৯টি ছবি এবং চারটি ভিডিও ধারণ করেন তিনি।

বিরল এই পাখিটির ইংরেজি নাম অরিয়েন্টাল ডুয়ার্ফ/ব্ল্যাক-ব্যাকড/থ্রি-টোড কিংফিশার। অ্যালসেডিনিডি গোত্রের এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ceyx erithaca। দৈর্ঘ্যে মাত্র ১২.৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৪ থেকে ২১ গ্রাম। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের বিস্তৃতি থাকলেও দেশে আবাস এলাকা ক্রমশ সংকুচিত হওয়ায় প্রজাতিটি হুমকির মুখে। তাই প্রকৃতির এই সৌন্দর্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন এই বিশেষজ্ঞ।