ভোরের আলো ফোটার আগেই পাখিদের ডাকে মুখর হয়ে ওঠে প্রকৃতি। এই সুরেলা ডাক মানুষের মনকে প্রশান্তি দিলেও পাখিদের জন্য এটি নিছক সৌন্দর্য ছড়ানোর ব্যাপার নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, পাখির গানের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রেম নিবেদন, এলাকা রক্ষা এবং যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক উদ্দেশ্য।

অধিকাংশ পুরুষ পাখি প্রজনন ঋতুতে গান গেয়ে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। সুরের বৈচিত্র্য ও শব্দের শক্তি দিয়ে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে। একইসাথে, সকালবেলার গান অনেক সময় নির্দিষ্ট এলাকা বা ‘টেরিটরি’ দখলের ঘোষণা হিসেবে কাজ করে, যা অন্য পুরুষ পাখিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

গানের এই জটিল প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে বিশেষ শারীরবৃত্তীয় ও স্নায়বিক কাঠামো। মানুষ যেমন স্বরযন্ত্র (Larynx) ব্যবহার করে কথা বলে, পাখিরা কথা বলে কণ্ঠ–অঙ্গ বা সিরিনক্স (Syrinx) দিয়ে। শ্বাসনালির নিচে অবস্থিত এই অঙ্গটির জটিল গঠনের কারণে পাখিরা একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন সুর তুলতে সক্ষম, যা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জেব্রা ফিঞ্চের মতো পাখিরা ছোটবেলায় বড়দের কাছ থেকে গান শেখে এবং এই শেখার প্রক্রিয়ার জন্য তাদের মস্তিষ্কে বিশেষ নিউরাল নেটওয়ার্ক গঠিত হয়।

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিচিকিৎসা অনুষদের সাবেক ডিন ও গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান জানান, পুরুষ পাখির গান নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক হরমোন হলো টেস্টোস্টেরন। প্রজনন ঋতুতে এই হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা গান গাওয়ার কার্যকলাপ বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এটি মস্তিষ্কের গান নিয়ন্ত্রণকারী নিউক্লিয়াস ও সিরিনক্সকে প্রভাবিত করে। এমনকি টেস্টোস্টেরন ইস্ট্রোজেনে রূপান্তরিত হয়ে গানের গঠন ও সংগঠনেও ভূমিকা রাখে। তবে সামাজিক পরিবেশ ও স্নায়ুতন্ত্রও গানকে প্রভাবিত করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। কোনো কোনো প্রজাতির স্ত্রী পাখিও গান গায় এবং তাদের গানও হরমোনের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

প্রকৃতিতে বিভিন্ন পাখির গানের ধরন ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। নাইটিঙ্গেল একটানা কয়েক ঘণ্টা জটিল ও সুরেলা গান গাইতে পারে, তার গলায় প্রায় ২০০ প্রকার সুর থাকে। অন্যদিকে পুরুষ কোকিলের বিখ্যাত ‘কু-উ কু-উ’ ডাক অনেক দূর থেকে শোনা যায় এবং এটি মূলত প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী কোকিলকে আকর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। বুলবুল নানা ছন্দে গান গায় এবং শহরাঞ্চলে সহজেই মানিয়ে নেয়। ময়না পাখি কণ্ঠ অনুকরণে মাস্টার, মানুষের ভাষা বা অন্য পাখির শব্দ নিখুঁতভাবে নকল করতে পারে। জেব্রা ফিঞ্চ শেখা ও অনুশীলনের মাধ্যমে গান করে, যার প্রক্রিয়া মানুষের ভাষা শেখার সাথে মিলে যায়। শ্যামা পাখির গান অনেকটা কথোপকথনের মতো, যেখানে প্রতিটি টোন একটি বার্তা বহন করে। টিয়া, চড়ুই, লাইরবার্ড ও মকিংবার্ডের মতো পাখিদেরও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গান গাওয়ার কৌশল ও উদ্দেশ্য।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাখির গান শোনা যাচ্ছে কম। বড় শহর বা শিল্পাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান কোলাহল—গাড়ি, কলকারখানা, হর্ন ও নির্মাণকাজের শব্দে পাখির গান চাপা পড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের শব্দমাত্রা প্রতি ১০ ডেসিবেল বাড়লে পাখিরা তাদের গানের সময়সীমা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে ফেলে। অনেক পাখি সঙ্গীর কণ্ঠে পৌঁছাতে না পেরে গান গাওয়াই বন্ধ করে দেয়। নগরায়ণের কারণে গাছ ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়ায় পাখিদের বাসা বাঁধার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, ফলে তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছে বা প্রজনন ঋতুতেও ফিরে আসছে না। বায়ুদূষণ ও কীটনাশক পাখিদের স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে তাদের গানের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুর স্বাভাবিকতা ব্যহত হওয়ায় পাখিদের প্রজনন ও গানের সময়ও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ হুমকি।