মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাইল হাওরপারের ছিকরাইল গ্রামে বর্ষার এই সময়ে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজেছে। যত দূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ফুটে থাকা সাদা শাপলার অপরূপ দৃশ্য যে কারও নজর কাড়বে। গত শনিবার দুপুরে জনবসতি পেরিয়ে হাওরের দিকে গেলে এই বিস্ময়কর রূপ চোখে পড়ে। মাছের খামারসংলগ্ন সড়কের পশ্চিম পাশের জলাভূমিতে অসংখ্য শাপলা ফুটে থাকতে দেখা যায়। আকাশে তখন ছিল রোদ-মেঘের খেলা; কোথাও আবার কিছুক্ষণ পরপর সূর্য ঢেকে যাচ্ছিল মেঘে, আবার ফিরে আসছিল প্রখর রোদ। এমন আবহে দমকা বাতাস কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছিল। শুধু শাপলাই নয়, কোথাও কোথাও জলের বুকে ফুটে থাকা গোলাপি ও সাদা পদ্মফুলও পথচারীদের মন কাড়ছে। হাওরে দেখা গেছে বড়শি হাতে মাছ ধরছেন কেউ, কেউবা গরু-বাছুর চরাচ্ছেন। পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে এক-দুটি নৌকাও; কোনোটি মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার কোনোটি দিয়ে শাপলা-শালুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। দূর থেকে যত দূর দেখা যায়, শুধু সাদা শাপলার সমারোহ। কোথাও একা একটি ফুল, কোথাও আবার অনেকগুলো একসাথে ফুটে আছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, ফুলগুলো বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখেই ফুটেছে। সবুজ পাতাগুলোও কম আকর্ষণীয় নয়, রোদে চকচক করা এসব পাতার ওপর দিয়ে ডাহুকসহ নানা জলজ পাখি হেঁটে বেড়াচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাদা শাপলা মূলত মিঠাপানির জলজ উদ্ভিদ। বর্ষা ও শরৎকালে বিল, হাওর, পুকুর ও নদীর শান্ত পানিতে এ ফুল বেশি ফোটে। সাধারণত সকালে ফুল ফোটে এবং রোদের তীব্রতা বাড়লে পাপড়ি ধীরে ধীরে মুড়ে যায়। হাওরপারের মানুষের কাছে সাদা শাপলার ডাঁটা বা পুষ্পদণ্ড একটি জনপ্রিয় সবজি, যা তরকারি বা ভাজি হিসেবে খাওয়া যায়। এর কন্দ ও ফলও সুস্বাদু হিসেবে বিবেচিত। ছিকরাইলের একটি মাছের খামারের জলাভূমিতে শাপলার পাশাপাশি ফুটে আছে অসংখ্য পদ্ম। সারি সারি পদ্মফুলে পানির বুক হালকা গোলাপি রঙে ভরে উঠেছে। বাতাসে দুলছে ফুল ও পাতা; কোথাও একা, কোথাও জোড়ায় জোড়ায় মাথা উঁচিয়ে আছে পদ্ম। শাপলার ভিড়েও দূর থেকে তাদের আলাদা করা যায়। পদ্মের পাতা বড় ও গোলাকার। পানির ওপর ভেসে থাকা পাতার বুকে জমে থাকা পানির ফোঁটা রোদে ঝিলমিল করছে। দু-একটি জলজ পাখি পাতার ওপর দিয়ে ছুটে বেড়ায়। তবে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত মাছের চাষ ও দূষণের কারণে প্রাকৃতিক বিলঝিলে পদ্মের বিস্তার আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে বলে এলাকাবাসী জানান। বেলা গড়িয়ে বিকেল নামলে আকাশ কখনো মেঘে ঢেকে যায়, কখনো আবার রোদে ঝলমল করে হাওর। বাতাসে দুলতে থাকে শাপলা-পদ্মের ফুল ও পাতা। কিছুক্ষণ পরপর জলজ পাখিগুলো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে বেড়ায়। একটি জলময়ূর পাতার ওপর অনেকক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ উড়ে যায়। ছিকরাইল হাওরপারে তখন ফুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি জল, বাতাস, পাখি আর বর্ষার প্রকৃতি মিলে এক মায়াময়, স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি হয়।
হাওরপারে সাদা শাপলা আর পদ্মের রঙিন সমারোহ
বর্ষার রূপে মৌলভীবাজারের হাইল হাওরপারের ছিকরাইল গ্রাম এখন সৌন্দর্যের এক অপূর্ব ঠিকানা। সেখানে জলাভূমিজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য সাদা শাপলা ও গোলাপি পদ্মফুল। প্রাকৃতিক এই দৃশ্য পর্যটকদের মন কেড়েছে। তবে জলাভূমি ভরাট ও দূষণে পদ্মের বিস্তার আগের তুলনায় কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।




