ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণেও খেলাপির সংখ্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গত মার্চ মাস শেষে যেসব গ্রাহকের ঋণ এক কোটি টাকার নিচে, তাদের মধ্যে খেলাপি হয়ে ওঠার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এই শ্রেণির খেলাপি গ্রাহক ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩ জন, কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ তা দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জনে। এতে স্পষ্ট হয়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সংখ্যাটি ২৪ লাখের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যা, জীবনযাপনের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া, পরিবারিক ঋণদেনার চাপ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কার্যক্রমে স্থবিরতা, এবং কৃষি খাতে ঋণ শোধের অক্ষমতাই এই উদ্বেগজনক উত্থানের পেছনে দায়ী। পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে চাকুরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীদের সবার আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদনের বিভিন্ন খাতের চিত্র ভেঙে দেখা গেছে, সিএমএসএমই খাতে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে কুটির শিল্পের অবস্থা করুণ, যেখানে খেলাপির হার প্রায় ৫৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। নির্মাণ খাতে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতেও তা প্রায় ৩০ শতাংশ। অপর দিকে, বাণিজ্যিক খাতে বিতরিত ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশই এখন অন্নাদায়ক হিসেবে চিহ্নিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও প্রকাশ পায়, বড় ঋণের শ্রেণিগুলোর পরিস্থিতিও সমানতালে নাজুক। ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ঋণেও খেলাপির হার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে এবং এই শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহক সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৮ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৫-এ উন্নীত হয়েছে। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ৪৫ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণেও তা সমঅন ৪৫ শতাংশ।

ছোট অংকের ঋণে খেলাপি হঠাৎ বৃদ্ধি পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় বিপদ সংকেত বলে মন্তব্য করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান জানান, পূর্বে কেবল বড় ঋণেই খেলাপি দেখা যেতো, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষি ও এসএমই খাতের ঋণও নিয়মিত না হওয়ার ঝুঁকিতে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শাখা ভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং বিশেষ নীতিমালার অধীনে ঋণ নিয়মিত করার চেস্টা চলছে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন এর বক্তব্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের মতো বড় আকারের অনিয়মিত ঋণ বাদ দিলে তাদের ব্যাংকের খেলাপির হার পুরো খাতের গড় থেকে কম। তিনি দাবি করেন, তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল মেহেদী এসএমই খাতের প্রসঙ্গ টেনে জানান, তাদের ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে মাত্র ৯৩ কোটি টাকা খেলাপি, যার বড় একটি অংশ করোনা মহামারীকালে খারাপ হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সময়মতো ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানে ব্যর্থ হলে তারা আর্থিক সংকটে পড়ে, যা খেলাপি প্রবণতা আরও বাড়ায়।