জাতীয় কবিতা পরিষদের উদ্যোগে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মঙ্গলবার বিকেলে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘শহীদের রক্তে লেখা হয় মুক্তির কবিতা’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদদের স্মরণে কবিতাপাঠ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা স্থান পায়। সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আয়োজনে জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে/ কত প্রাণ হলো বলিদান’ গানটি পরিবেশন করা হয়। সংগঠনের সভাপতি কবি মোহন রায়হানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি স্বাগত বক্তব্যে জানান, আশির দশকে স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের পটভূমিতে জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠিত হয়। সে সময় কবিরা কেবল লেখনি নয়, বরং রাজপথেও প্রতিবাদে সরব ছিলেন। একই ধারায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও সংগঠনের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে রাজপথে নামেন। মোহন রায়হানের মতে, ওই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র, শ্রমিকসহ অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা তা বাস্তবায়নে কবিরা তাঁদের সংগ্রামী ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আলোচনা পর্বে বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হলেও একটি সহনশীল সমাজ গঠনের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখন ম্লান হয়ে আসছে। তিনি মব সন্ত্রাস ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর হামলার ঘটনায় অভ্যুত্থানের চেতনা ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। কবিতা পরিষদকে প্রগতিশীলতার পতাকা উঁচু করে এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি।

সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা বেলাল চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটলেও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন এবং সামরিক জোটে যোগদানের মতো কার্যক্রম চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, বৈষম্য আবার ফিরে আসছে, দুর্নীতি ও উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এসব কর্মকাণ্ড জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তারা আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মানুষের মধ্যে সাহস ও ঐক্যের বোধ জাগ্রত করেছে। সেই চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের আলোকে একটি উদার ও মানবিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সহসভাপতি মোহাম্মদ তৌহিদ, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহসভাপতি কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া, বাংলাদেশ জন রাষ্ট্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মুহম্মদ উল্লাহ এবং সার্বভৌম আন্দোলনের মুখপাত্র শামীম রেজা।

আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা পাঠ ও সংগীত পরিবেশনায় সাজানো হয়েছিল এই অনুষ্ঠান। সংগীত পরিবেশন করেন হৃদিকা, ঈষান, আবির বাঙালি ও রাকিব ফরায়েজি। কবিতা পাঠ করেন রাসেল আহমেদ, নিথর মাহবুব, ইউসুফ রেজা, কাব্য রাসেল, তাসকিনা ইয়াসমিন, রফিক হাসানসহ প্রায় অর্ধশত কবি। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি নাহিদ হাসান।