বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানব পাচারের ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র চাকরিপ্রার্থীদের প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিদেশে গিয়ে চাকরি তো মিলছেই না, বরং নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন অনেকে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া নাগরিকদের মধ্যে গত কয়েক বছরের মতো এবারও শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশিরা। অন্যদিকে, গ্রিসে যেতে সমুদ্রপথ ব্যবহারকারীদের তালিকায় প্রথমবারের মতো শীর্ষস্থানে এসেছে বাংলাদেশ। অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা গ্রিসে যেতে কর্মীদের প্রথমে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে অনেক ক্যাম্পে কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হন এবং জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরও থামছে না ইউরোপগামী এই স্বপ্নযাত্রা। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের তথ্য উদ্ধৃত করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইতালিতে প্রবেশ করেছেন আরও ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, পাচার বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপযাত্রা ঠেকাতে শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং গন্তব্য দেশগুলোরও সতর্কতা প্রয়োজন। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনিয়মে জড়িত ৪৯টি এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার এবং রাশিয়ায় পাঠানো তিনটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। কম্বোডিয়ায় ছাড়পত্র দেওয়ার আগে বিএমইটিকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচারসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ এসব মামলার তদন্ত করছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন করে ৭১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৬টি, মার্চে ১১০টি, এপ্রিলে ১৩০টি এবং মে মাসে ১২৩টি মামলা হয়েছে। অথচ এই সময়ে মাত্র ১৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। আজ ৩০ জুলাই বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে, যার প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দী’। বর্তমানে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু জানায়, গত বছর রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন বাংলাদেশি, যা আগের বছর ছিল ৯৯৩ জন। তবে একটি চক্র কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২ হাজার ১২৫ জন কর্মী রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন। অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসছেন, কেউ কেউ সেখানেই মারা যাচ্ছেন। গত বছর লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমকে সেনানিবাসে বাবুর্চির কাজের কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো হলেও তাকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে পালিয়ে সাত মাস পর বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন তিনি। প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। একসঙ্গে থাকা ১৬ জনের মধ্যে ৪ জন মারা যাওয়ায় তিনি আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন বলেও জানান। চাকরির নামে পাচারের আরেক গন্তব্য কম্বোডিয়া। সেখানে কল সেন্টারে চাকরির নামে নিয়ে গিয়ে অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হয় কর্মীদের। আন্তর্জাতিক চাপে সম্প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব স্ক্যাম সেন্টার বন্ধ করে দিলে জুন মাসে ৫৮৩ জন কর্মী দেশে ফিরে আসেন। তবে গত দেড় বছরে বিএমইটি ১৫ হাজারের বেশি কর্মীকে কম্বোডিয়া যেতে ছাড়পত্র দিয়েছে। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আগে জোর করে পাচার হতো, এখন মূলত অভিবাসনের নামে পাচার হচ্ছে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যেকোনো মূল্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা থেকেই মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছে। পাচারকারীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই সেখানে চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশ বলেছেন, জোর করে প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না, ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ২৭ শতাংশ ভয়াবহ শারীরিক এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশেও চাকরির প্রলোভন দিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। প্রতারিত কর্মীরা ফিরে এসে মানব পাচারের মামলা করছেন, কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে নিহত হওয়া প্রবাসীর পরিবারও মামলা করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মানব পাচার আইনে দায়ের করা ৪ হাজার ৪২৭ মামলার ৯৪-৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। পাচারকারীদের বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় এই অপরাধ থামছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশে চাকরির প্রলোভনে প্রতারণা ও মানব পাচার অব্যাহত, শাস্তির অভাবে সংকট বাড়ছে
বিদেশে চাকরির নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। ইউরোপযাত্রায় বাংলাদেশিরা শীর্ষে থাকলেও লিবিয়ায় নির্যাতন ও জিম্মির ঘটনা ঘটছে। সরকার কঠোর অবস্থান নিলেও পাচারকারীদের শাস্তির অভাবে সংকট থামছে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।




