ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা থেকে এবার প্রায় ৮৬৬ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে বাজেটের আকার বাড়লেও পুরো অর্থ ব্যয় হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, কারণ আগের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। চলতি বাজেটে আগের অর্থবছর থেকে অব্যয়িত ৭৩০ কোটি ৯৩ লাখ টাকাও যুক্ত করা হয়েছে, যা নতুন করে আয় হবে না। অন্যদিকে, অর্থবছর শেষে ৫৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা অব্যয়িত থাকবে বলে ধরা হয়েছে। ফলে ঘোষিত ৪ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই নাগরিক সেবা ও উন্নয়নে ব্যয় করার পরিকল্পনা নেই।
বৃহস্পতিবার নগর ভবনে বাজেট ঘোষণা করেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি জানান, উচ্চাভিলাষী বড় অঙ্কের বাজেট না করে বাস্তবায়নযোগ্য ও যৌক্তিক বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। নগরবাসীর ওপর নতুন কর আরোপ বা করের হার না বাড়িয়ে নতুন আয়ের খাত সৃষ্টি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর কথা বলেন তিনি। ২৬ জুলাই ডিএসসিসির পরিচালনা কমিটির সভায় বাজেটটি অনুমোদিত হয়।
অতীতের বাস্তবায়ন পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৭৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকার বাজেটের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৯৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা ঘোষিত বাজেটের ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ। পরের বছর ২০২৩-২৪ সালে বাজেট ছিল ৬ হাজার ৭৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, বাস্তবায়ন হয় ২ হাজার ৫৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা বা ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট আরও বাড়িয়ে ৬ হাজার ৭৬০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা করা হলেও বাস্তবায়ন হয় ২ হাজার ১৫৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ। তিন অর্থবছরের গড় বাস্তবায়ন ৩৩ শতাংশের বেশি নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট কমিয়ে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা করা হয়, যা পরে সংশোধিত হয়ে ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় নামে। এক বছরের মধ্যেই ৭০২ কোটি ৬১ লাখ টাকা বাদ পড়ে।
পরিচ্ছন্নতা খাতে বরাদ্দ গত অর্থবছরের সংশোধিত ৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২৭ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা চার গুণের বেশি। তবে এই খাতের ১৮০ কোটি টাকা অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরির জন্য বরাদ্দ। নর্দমা ও নিকাশি পরিষ্কারে ৫৫ কোটি, জ্বালানিতে ১৯ কোটি এবং ব্যবস্থাপনায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। মূলধন ব্যয় মাত্র ৩৮ কোটি টাকা। ফলে পরিচ্ছন্নতার বরাদ্দ চার গুণ বাড়লেও তা পরিচ্ছন্নতার সক্ষমতা চার গুণ বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয় না। প্রশাসক ‘ক্লিন সিটি–গ্রিন সিটি’ বাস্তবায়নে পরিচ্ছন্নতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও শ্রমিক নিয়োগ, দৈনিক বর্জ্য অপসারণ ও কাজের মূল্যায়ন সূচক নিয়মিত প্রকাশ না করলে বড় বরাদ্দের সুফল যাচাই করা কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ গত অর্থবছরের সংশোধিত ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে। তবে এর ৫৫ কোটি টাকা অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি এবং ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা মশা নিধনের কীটনাশকের জন্য। ওষুধ ও প্রতিষেধকে বরাদ্দ মাত্র ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, আর হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ মূলত মশক নিয়ন্ত্রণের জন্যই। প্রশাসক জানান, চার বছরের এডিস মশার লার্ভা জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া গেছে।
আয়ের লক্ষ্যমাত্রায় এককালীন উৎসের ওপর নির্ভরতা লক্ষণীয়। ৪০০ কোটি টাকা ‘দায় বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ২০০ কোটি টাকা সাসপেন্স হিসাবে জমা এবং ২০০ কোটি টাকা ঠিকাদারদের নিরাপত্তা জামানত থেকে আসবে। এগুলো নিয়মিত রাজস্ব নয়। সড়ক খনন ফি থেকে ২০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ধরা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতের প্রকৃত আয় ছিল মাত্র ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই লক্ষ্য ঢাকা ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪১৫ কিলোমিটার সড়ক খোঁড়ার সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। উন্নয়ন আয়ের লক্ষ্য ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত প্রাপ্তি ছিল প্রায় ৫৩৬ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্য ১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা হলেও প্রকৃত ব্যয় ছিল ৮১৪ কোটি টাকা।
প্রশাসক ওয়ার্ডভিত্তিক গণশুনানি, জবাবদিহি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর কথা বলেছেন, যা ইতিবাচক। তবে পরিস্থিতি বদলাতে তিন মাস পরপর আয়-ব্যয়ের অগ্রগতি প্রকাশ, প্রকল্পভিত্তিক অর্থ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য খাতে পরিমাপযোগ্য ফলাফল জানানো প্রয়োজন। তা না হলে চার হাজার কোটি টাকার বাজেটও আগের মতো বড় ঘোষণা ও ছোট বাস্তবায়নের উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।




