রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে আজ শুক্রবার 'সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান' শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনের আয়োজন করে সম্মিলিত সনাতন পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যারা একাত্তরকে ভুলে যেতে চায় বা ভুলিয়ে দিতে চায়, তারা কখনো বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না। কারণ বাংলাদেশে বিশ্বাস করতে হলে একাত্তরকে সামনে আনতেই হবে। সেই চেতনা নিয়েই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে তিনি মত প্রকাশ করেন।
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, একাত্তরকে সামনে আনার অর্থ চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানকে পেছনে রাখা নয়। বরং একাত্তরের পাশাপাশি জুলাইকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জুলাইয়ের অসংখ্য সন্তান বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছে এবং ফ্যাসিস্ট সরকারকে দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একাত্তর ও চব্বিশ—কোনোটিকেই ছোট করে দেখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন দলটির মহাসচিব।
সভায় একটি গোষ্ঠী সচেতনভাবে ধর্মের নামে দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে চায় বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ধর্মের নামে যারা দেশকে বিভাজনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, তাদের রুখে দিতে হবে। উগ্রবাদ ও মৌলবাদকে কোনো প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি উগ্রবাদ ও মৌলবাদ রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি কাউকে 'সংখ্যালঘু' মনে করে না। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে দল ও ভবিষ্যৎ সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে। এ জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পেছনে এবার সংখ্যালঘুদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সেই কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে লালন করেন। সরকারের কাছে দেশের সব নাগরিক সমান। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা যেকোনো মতের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে। বিএনপি সরকার সেই অধিকার রক্ষায় আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, যেকোনো পরিস্থিতির বিশ্লেষণে পক্ষপাত না করে নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক পটভূমি বিচারে শুধু সাম্প্রতিক দু–এক বছর নয়, বরং আগের সব ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বক্তারা আরও বলেন, কোনো অপরাধ ঘটলে তা কেবল নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন হিসেবে না দেখে সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্যে গরমিল থাকলে সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়। তাই বিভ্রান্তি এড়াতে ঐক্যবদ্ধ ও নির্ভুল তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
সভা সঞ্চালনা করেন সম্মিলিত সনাতন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার আচার্য এবং সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। এতে আরও বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ–৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৪৬টি সংগঠনের প্রতিনিধি অশোক তরু সাহা মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে হারে নির্যাতন বেড়েছে, সেটা যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তিনি অবিলম্বে সরকারকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখার দাবি জানান।
মতবিনিময় সভায় সম্মিলিত সনাতন পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বেশ কিছু দাবি উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া হামলা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা, হিন্দুধর্মীয় উৎসবগুলোয় যথাযথ সরকারি ছুটি দেওয়া এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে সরকারি জায়গা বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পাশাপাশি এই ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।




