প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ এলে যেন বদলে যায় পুরো বাংলাদেশ। ছাদে ছাদে রঙিন পতাকা, দোকানের সামনে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা পর্তুগালের জার্সি। এসব দেশের ভাষা না জানলেও, তাদের জয়-পরাজয় একইভাবে টেনে নেয় এ দেশের সাধারণ মানুষের ঘুম, মন আর বন্ধুত্ব। একটি গোলের মুহূর্তে চায়ের দোকানের বিবর্ণ পর্দায় ভেসে ওঠা গর্জন যেন পাড়া-মহল্লার প্রতিটি কোণে আলোড়ন তুলে দেয়। সমর্থকদের এই পাগলামিকে 'ফুটবল পাগলামি' বলে চালিয়ে দিলেও, এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর এক মানসিক বন্ধন।

মানুষ কেন নিজের দেশ নয়, অথচ অচেনা কোনো দেশের দলের জন্য এভাবে বুক কাঁপায়? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের 'আমি কার?' এই চিরন্তন জিজ্ঞাসায়। সভ্যতার চেয়েও পুরোনো প্রশ্ন—আমার পাশে কে? আমি কার সঙ্গে দাঁড়ালে ছোট না থাকি? বিশ্বকাপ সেই অহমের জন্য এক মঞ্চ তৈরি করে দেয়, যেখানে ৯০ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয় সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয়ের এক অনন্য কাব্য। কেউ মেসির পায়ের জাদুতে নিজের প্রতিভার স্বপ্ন খুঁজে পায়, কেউ রোনালদোর নিরলস সংগ্রামে নিজের কঠিন জীবনকে দেখে। তাই একজন সমর্থক যখন বলেন 'আমার দল জিতেছে', তখন তিনি শুধু দলের জয় উদযাপন করছেন না, বরং নিজের অহমকে একটু বড় করে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

সাবেক এক ক্রীড়া সাংবাদিক সম্প্রতি এই আবেগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায়। তাঁর মতে, সমর্থন কখনো জন্মসূত্রের নয়, বরং স্মৃতিসূত্রের। কারও বাবা ব্রাজিল সমর্থন করতেন বলে সন্তান সেই পতাকার নিচে দাঁড়ায়, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভাঙা টিভির সামনে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা প্রথম ম্যাচের রাতকে সঙ্গী করে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে। এই সংযোগ এতই গভীর যে, নিজের দলের পরাজয় অনেক সময় ব্যক্তিগত পরাজয়ের মতো মনে হয়। কিন্তু বিপদ শুরু হয় যখন সেই আবেগ অহমে পরিণত হয়। 'মেসিকে ছোট করলে তুমি আমাকে ছোট করছ'—এই পর্যায়ে চলে গেলে ফুটবল আর খেলা থাকে না, বরং সেটি হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার যুদ্ধ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জেতার আনন্দের চেয়ে প্রতিপক্ষের কান্না বা হারকে মিম হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া যেন ভালো সমর্থক হওয়ার একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ, নিজের নায়ককে বড় প্রমাণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে মাটিতে নামিয়ে ফেলা মহত্ত্বের অপমান। একজন অসাধারণ খেলোয়াড় বা দলকে সম্মান করা দুর্বলতা নয়, বরং নিজের আত্মসম্মানের পরিচয়। যে মানুষ জানে যে তার প্রিয় দল হারতে পারে, তার সমর্থন নিভে যেতে পারে, তবু তার মাথা নিচু হয় না—সে-ই সত্যিকারের ফুটবলপ্রেমী।

লেখার উপসংহারে বলা হয়, ফুটবলের আসল সৌন্দর্য হারিয়ে যায় যখন সমর্থক নিজের অহমের প্রহরী হয়ে ওঠে। তখন গোলের নান্দনিকতা, পাসের কারুকার্য সবই ব্যক্তিগত আঘাত মনে হয়। অথচ প্রতিপক্ষের অসাধারণ গোলকে 'দারুণ' বলতে শেখার মধ্যে দিয়েই ফুটবল জিতে নেয় নিজের জায়গা। সাবেক এই সাংবাদিকের মতে, হয়তো একদিন সেই চায়ের দোকানের ছেলেটিও দ্বিতীয়বার সেই গোল দেখবে—প্রথমবার পরাজয় দেখেছিল, দ্বিতীয়বার দেখবে কত সুন্দর একটি গোল ছিল। হার স্বীকার করেও খেলার সৌন্দর্যকে উপভোগ করার শিক্ষাই ফুটবলের চিরন্তন বার্তা।