মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবসরভোগী ব্যবস্থা বর্তমানে গভীর সংকটের মুখোমুখি। সামাজিক সুরক্ষা ট্রাস্ট ফান্ড ২০৩২ সালের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রতিশ্রুত সুবিধাগুলোতে বড় ধরনের কাটছাঁট প্রয়োজন হবে। সরকারি সুবিধার বাইরে, অধিকাংশ কর্মীর সঞ্চয় অত্যন্ত কম। ভ্যানগার্ডের পরিচালিত ৪০১(কে)-ধরনের পরিকল্পনায় ৫ মিলিয়ন অংশগ্রহণকারীর মধ্যম ব্যালেন্স গত বছর ছিল মাত্র ৪৪,১১৫ ডলার। অথচ বেসরকারি খাতের প্রায় ৪০% কর্মীর এই ধরনের পরিকল্পনায় প্রবেশাধিকারই নেই।
ঠিক এমন এক সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার বেসরকারি পেনশন মডেলের দিকে ঝুঁকছেন। বিশ্বের সবচেয়ে ঈর্ষণীয় অবসরভোগী পরিকল্পনা হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার সুপারঅ্যানুয়েশন ফান্ড ব্যবস্থা এখন নতুন উচ্চপ্রোফাইল সমর্থক পেয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প এই নিয়োগকর্তা-অর্থায়িত, বেসরকারি পরিচালিত ব্যবস্থার প্রশংসা করে আসছিলেন। সম্প্রতি তিনি ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ও কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লুটনিককে নির্দেশ দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার এই মডেল অধ্যয়ন করতে। কংগ্রেসের সাথে আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন অবসরভোগী ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কৌশল নির্ধারণের অংশ হিসেবে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ৬ জুলাই এক মন্তব্যে ট্রাম্প বলেন, "অস্ট্রেলিয়ায় একটি পরিকল্পনা রয়েছে যা মানুষ সত্যিই পছন্দ করে। এটি সত্যিই খুব ভালোভাবে কাজ করছে। আমরা সেটি নিয়ে কংগ্রেসের সাথে আলোচনা করব এবং দেখব এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা।" ওই দিনই তিনি ব্ল্যাকরক ইনকর্পোরেটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ল্যারি ফিঙ্কের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ফিঙ্ক বেশ কয়েক বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার এই মডেলের পক্ষে সোচ্চার। ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে তিনি মার্কিন ব্যবস্থার সমস্যা ও অস্ট্রেলিয়ার সাফল্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
অস্ট্রেলিয়ার পেনশন ব্যবস্থা ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে গৃহীত এক আইনের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ওই আইন নিয়োগকর্তাদের কর্মীদের মজুরির একটি অংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনাধীন পেনশন তহবিলে জমা দিতে বাধ্য করে। বর্তমানে এই হারে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে কর্মীদের বেতনের ১২% পৌঁছেছে, খণ্ডকালীন কর্মীরাও এর আওতায় রয়েছেন। সব মিলিয়ে এই ব্যবস্থার আকার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বর্তমানে এটি ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী এক দশকের মধ্যে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবসরভোগী পরিকল্পনা হওয়ার পথে রয়েছে।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ, যিনি মার্কিন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কট্টর সমালোচক, ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন। ৮ জুলাই এক্স প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে তিনি বলেন, "আমি আইন প্রণয়ন করছি যাতে প্রতিটি আমেরিকানের—বারটেন্ডার থেকে শুরু করে গিগ কর্মী পর্যন্ত—সম্পদ গড়ে তোলার, আমেরিকান ড্রিমের একটি অংশ নিজের করার এবং আমাদের দেশের সমৃদ্ধিতে অংশীদার হওয়ার সুযোগ থাকে।"
তবে অবসরভোগী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবস্থা আমেরিকার জন্য সহজ সমাধান নয়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রিটায়ারমেন্ট সিকিউরিটি প্রজেক্টের পরিচালক গোপী শাহ গোডা বলেন, সরকার যদি সামাজিক সুরক্ষা প্রতিস্থাপন করতে চায়, তবে ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুত সুবিধাগুলো কীভাবে পরিচালনা করবে তা নির্ধারণ করতে হবে, যা বর্তমানে প্রধানত পে-রোল করের মাধ্যমে অর্থায়িত হয়। কিছু কর্মকর্তা 'সার্বভৌম সম্পদ তহবিল' গঠনের ধারণা দিয়েছেন যা সামাজিক সুরক্ষা ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু গোডার মতে এর নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
বোস্টন কলেজের সেন্টার ফর রিটায়ারমেন্ট রিসার্চের সিনিয়র উপদেষ্টা এলিসিয়া মানেল মনে করেন মার্কিন ব্যবস্থা আরও ভালোভাবে ডিজাইন করা। তিনি বেসরকারি ব্যবস্থাপনাধীন ৪০১(কে)-ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং মুদ্রাস্ফীতি-সামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা পেমেন্টের সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ানরাও তাদের বিনিয়োগকে দীর্ঘস্থায়ী আয়ের ধারায় রূপান্তর করতে সংগ্রাম করছে। তিনি বলেন, "আমরা জানি কী করতে হবে: সামাজিক সুরক্ষা ঠিক করুন এবং কর্মক্ষেত্রে অবসরভোগী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত কর্মীর সংখ্যা বাড়ান।"
এছাড়াও, যেকোনো বাধ্যতামূলক নিয়োগকর্তা অবদান ব্যবসায়ীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় কর্পোরেশনগুলো যুক্তি দিয়েছে যে এই অর্থ অন্যথায় বেতন বৃদ্ধিতে যেত। গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা এ বিষয়ে বিভক্ত।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার মডেল পছন্দ করলেও এখনই বলা সম্ভব নয় যে চূড়ান্ত পরিকল্পনা হুবহু সেই নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করবে। ট্রাম্প নিজেও তার সাম্প্রতিক মন্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তার প্রশাসন "সেটি গ্রহণ করে হয়তো আরও কিছুটা তীক্ষ্ণ ও আরও কিছুটা ভালো করে তুলবে।"



