শিরোনামের ভয় আর বাস্তবের উষ্ণতা—এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর ১২৬টি দেশ ঘুরে বেড়ানো লি ও ম্যান্ডির কাছে সেই ব্যবধান স্পষ্ট। তাঁদের মতে, টেলিভিশন বা সংবাদপত্রে যে পৃথিবীকে প্রায়ই ভয়ংকর ও বিপজ্জনক দেখানো হয়, বাস্তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ মানুষই সাহায্য করতে চায়, নিজের ঘরে আমন্ত্রণ জানায় এবং চায় যে ভ্রমণকারী তাঁদের দেশটিকে ভালোবেসে ফিরে যান।

এই বিশ্বাসই তাঁদের ৩০ বছরের যাত্রার সারসংক্ষেপ। ম্যান্ডি বলেছিলেন, খারাপ মানুষ অবশ্যই আছে, কিন্তু সংখ্যায় তারা অত্যন্ত কম। লির কথায়, বেশির ভাগ মানুষই ভালো। দুজনের চোখে ফুটে ওঠা হাসিই যেন দীর্ঘ পথচলার পর অর্জিত এক গভীর উপলব্ধির প্রকাশ।

আফ্রিকার গল্প তাঁদের স্মৃতিতে বিশেষভাবে উজ্জ্বল। ২০১০ সালে একটি ওভারল্যান্ড ট্রাক অভিযানে যোগ দিয়ে ৪০ সপ্তাহ ধরে ২৬টি দেশ অতিক্রম করেন তাঁরা। জিব্রাল্টার থেকে শুরু হয়ে মরক্কো, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল, ঘানা, ক্যামেরুন, কঙ্গো, অ্যাঙ্গোলা, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া, কেনিয়া ও ইথিওপিয়া হয়ে মিসর পর্যন্ত—এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেক রাত কেটেছে জঙ্গলের ধারে তাঁবুতে। বিদ্যুৎ ছিল না, গোসলের পানি ছিল সীমিত, বিলাসিতার ছিটেফোঁটাও ছিল না। তবু প্রতিটি সকাল ছিল বিস্ময়ে ভরা। কোনো দিন জিরাফ দাঁড়িয়ে থাকত তাঁবুর সামনে, কোনো দিন হাতির পাল হেঁটে যেত দূরের জঙ্গলে, কখনো সিংহের দেখা মিলত দূর থেকে। কিন্তু বন্য প্রকৃতির চেয়েও বেশি মনে আছে মানুষের কথা।

পশ্চিম আফ্রিকায় নাইজেরিয়া, কঙ্গো কিংবা ক্যামেরুনের নাম শুনে অনেকে ভয় পায়, কিন্তু সেই দেশগুলোর ছোট গ্রামে গিয়ে তাঁরা দেখেছেন অন্য এক পৃথিবী। শিশুরা দৌড়ে এসে হাত নাড়ছে, বয়স্করা কৌতূহলে গল্প করতে চাইছেন, কেউ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, কেউ শুধু হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে যাচ্ছেন। লি বলেছিলেন, ভয় ছিল—কিন্তু মানুষের জন্য নয়, বরং নিজেদের পূর্ব ধারণাগুলোর জন্য। ম্যান্ডির মতে, অনেক সময় পৃথিবী নয়, আমাদের ধারণাগুলোই সবচেয়ে বড় দেয়াল তৈরি করে।

বরফে ঢাকা রাশিয়ার গল্পও ছিল তেমনই উষ্ণ। ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত যাত্রায় জানালার বাইরে ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঠান্ডা, জমে যাওয়া বৈকাল হ্রদ, অন্তহীন বনভূমি। একই কামরায় দিনের পর দিন থাকা অচেনা মানুষের সঙ্গে কয়েকটি রুশ শব্দ, এক কাপ গরম চা আর একটি হাসিই গড়ে তুলেছিল বন্ধুত্ব। অনেকে বলেছিল, রাশিয়ায় গেলে ভদকা খাওয়ানো হবে; কিন্তু তাঁরা দেখলেন, মানুষ বরং চা ভাগাভাগি করে খেতে বেশি ভালোবাসে।

মধ্য এশিয়ার সিল্ক রোডের দেশগুলো—কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান—তাঁদের কাছে ইতিহাস মানে কেবল পুরোনো স্থাপত্য নয়। ইতিহাস মানে সেই মানুষগুলো, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানিয়ে এসেছে। যাযাবরদের তাঁবুতে ধোঁয়া ওঠা চা, স্থানীয় রুটি, ঘোড়ার দুধের ঐতিহ্যবাহী পানীয়—প্রতিটি খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গল্প, আর প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রে একজন মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার বিপরীতে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুয়েতে একটি স্থানীয় পরিবারের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ থাকার সময় তাঁরা দেখেছেন, সেই পরিবার শুধু বাড়ির দরজাই খুলে দেয়নি, খুলে দিয়েছিল নিজেদের সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবনের গল্প। প্রথম সকালের নাশতার বিল গোপনে পরিশোধ করে গিয়েছিলেন একজন অচেনা ব্যক্তি। সৌদি আরবে খেয়েছেন জীবনের সবচেয়ে সুস্বাদু খেজুর। ইরাকি কুর্দিস্তানে কেউ জুসের দাম দিতে দেননি। তাজিকিস্তানেও ঘটেছিল একই ঘটনা। তাঁদের মতে, আতিথেয়তা কোনো পর্যটন-সেবার অংশ নয়, এটি মানুষের সহজাত সৌজন্য।

কোভিড-১৯ পৃথিবীকে থামিয়ে দিলেও তাঁদের স্বপ্ন থেমে থাকেনি। সেই সময় ম্যান্ডির ক্যানসারের চিকিৎসাও চলছিল। তবু তাঁরা নতুন করে শিখেছিলেন—জীবন কখনোই নিশ্চিত নয়, তাই স্বপ্নগুলোকে বারবার পিছিয়ে দেওয়ারও কোনো মানে নেই। ভ্রমণ তাঁদের কাছে শুধু পৃথিবী দেখার উপায় নয়, জীবনকে নতুন করে দেখারও একটি পদ্ধতি।

নতুন ভ্রমণকারীদের জন্য তাঁদের পরামর্শ—যাত্রার আগে যথাসম্ভব পড়াশোনা করুন, স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানুন, যেখানে স্থানীয়রা খায় সেখানেই খাওয়ার চেষ্টা করুন, সব সময় কিছু নগদ অর্থ সঙ্গে রাখুন। আর একটি ছোট চামচ সঙ্গে রাখার পরামর্শও দিলেন হাসিমুখে—বরফজাত মিষ্টি খাবার খাওয়া থেকে ফল কাটা, সুপারমার্কেটের খাবার কিনে পার্কে বসে খাওয়া পর্যন্ত, ছোট্ট এই প্রস্তুতি অসংখ্য সমস্যার সমাধান করে দেয়। এটি যেন তাঁদের পুরো জীবনদর্শনের প্রতীক: সুখ অনেক সময় বড় কিছুর মধ্যে নয়, ছোট ছোট প্রস্তুতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের মানুষের কথা বলতে গিয়ে ম্যান্ডি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। পরে ধীর গলায় বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ আন্তরিক। রাস্তায় বের হলেই কেউ না কেউ কথা বলতে চায়, সাহায্য করতে চায়, আপন করে নিতে চায়। তাঁর একটাই আশা—পর্যটন যতই বাড়ুক, এই আন্তরিকতা যেন কখনো হারিয়ে না যায়। লি যোগ করলেন, অনেক দেশে দেখেছেন, পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের জায়গাটা ব্যবসা দখল করে নেয়। বাংলাদেশ যেন সেই পথে না হাঁটে। এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাদের হৃদয়।

নেপালে এক ভালোবাসা দিবসে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। সেই থেকে ক্লান্তিবিহীন পথচলায় পেরিয়েছেন অসংখ্য দেশ ও সভ্যতা। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোসহ বহু বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলো কোনো তারকার ঘিরে নয়। বরং এক আপেল বিক্রেতা, একজন দোকানদার, একজন ট্যাক্সিচালক কিংবা সেই অচেনা মানুষ—যিনি নিঃশব্দে অন্যের সকালের নাশতার বিল পরিশোধ করে চলে গিয়েছিলেন—এই সাধারণ মানুষের সঙ্গে জড়িত।

বিদায় নেওয়ার পর মনে হয়েছিল, তাঁরা যেন দুটি ভ্রমণকারীর সাক্ষাৎকার নয়, বরং মানুষের ওপর নতুন করে বিশ্বাস স্থাপনের গল্প বলে গেছেন। যদি আমরা পৃথিবীকে শুধু সংবাদ শিরোনামের চোখে দেখি, তাহলে ভয়ই দেখব। কিন্তু যদি মানুষের চোখে দেখি, তাহলে আবিষ্কার করব—ভাষা, ধর্ম, সীমান্ত ও রাজনীতির ওপারেও মানুষ আসলে মানুষেরই আপন। হয়তো এই বিশ্বাসটুকুই ম্যান্ডি ও লির তিন দশকের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি; আর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্য যে মানুষ, সেই সত্যের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।