জনসমাগমপূর্ণ স্থানে অচেনা কারও ফোন থেকে আসা উচ্চ শব্দ অনেক সময় গভীর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাস, মেট্রোর কামরা, রেলগাড়ি, বিমানবন্দর অথবা লিফটে হঠাৎ করেই দেখা যায়—পাশের সিটে বসে কেউ টিকটক বা ছোট ভিডিও দেখছেন স্পিকারে। কখনো আবার জোরে কথা বলছেন ফোনে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের মনে হতে পারে, ভিডিও দেখতে ভালোবাসলেও অন্যের ফোনের বিরক্তিকর আওয়াজ শুনতে চাওয়ার কোনো কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ স্যামি ওয়াকার হেরেরা এই বিষয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, মনে মনে রাগ করা আর সরাসরি কাউকে শব্দ কমাতে বলা—এই দুটির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। কাউকে নিষেধ করলে সে যদি রেগে যায়, কথা না শোনে কিংবা উল্টো আরও জোরে শব্দ বাড়িয়ে দেয়—তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সেজন্য ঝগড়া বা ঝামেলা এড়িয়ে কীভাবে বিষয়টি সামাল দেওয়া যায়, সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমেই নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—সত্যিই কি কিছু বলা প্রয়োজন? অনেক সময় সবচেয়ে সহজ পথ হলো নীরবে সেই স্থান ত্যাগ করে অন্য কোথাও সরে যাওয়া। লাস ভেগাসের শিষ্টাচার প্রশিক্ষক নিকোল দেল ভ্যালে রোজের ভাষ্য, কোনো বিবাদে জড়িয়ে না পড়ে চুপচাপ সরে যাওয়াই মাঝে মাঝে সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, অন্যের প্রতিটি ভুল ধরে ঠিক করার নাম শিষ্টাচার নয়; বরং এমন আচরণই উত্তম, যাতে সকলেরই মঙ্গল হয়। কফি শপে অন্য কোনো টেবিল খালি থাকলে বা ট্রেনে বসার অন্য জায়গা থাকলে সেখানে চলে যাওয়াই উত্তম। কয়েক সেকেন্ডেই সমস্যা মিটে যাবে, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বিতর্কও জন্ম নেবে না। তবে যেখান থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই, সেখানেই কেবল কথা বলা উচিত।
অন্যের খারাপ আচরণ দেখলে তাকে দোষারোপ করতে ইচ্ছা হতে পারে, কিন্তু সেই ইচ্ছা চেপে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। ‘স্পিক ইয় অল’ নামের যোগাযোগবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ওয়াকার হেরেরা পরামর্শ দেন, আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে সামনের ব্যক্তি নিজের ভুল ঢাকতে গিয়ে রেগে উঠুক। সে ভুল করছে না ভেবে শুধু শব্দের কারণে আপনার কী ধরনের কষ্ট বা অসুবিধা হচ্ছে, সেটি বিনয়ের সঙ্গে বুঝিয়ে বলুন। আপনি জানেন না সে কেন এত জোরে ফোনের আওয়াজ দিয়ে রেখেছে। হতে পারে তার শ্রবণশক্তি কম, অথবা সে হয়তো বুঝতেই পারছে না যে ফোনের শব্দ কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। তাই ব্যক্তিকে খারাপ ভাবার পরিবর্তে শুধু আওয়াজ কমানোর জন্য বিনীত অনুরোধ জানালে তার কথা শোনার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়।
সরাসরি কোনো আদেশ না দিয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে কথা শুরু করা উত্তম। কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব রাখলে কাজটি আরও সহজ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনে অবস্থিত টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ল্যারি স্কুলার প্রথমে জানতে চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন—ব্যক্তি কী শুনছেন। উত্তর পাওয়ার পর বলা যেতে পারে, “আমার একটি কাজে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু শব্দের জন্য সমস্যা হচ্ছে। আপনি কি আওয়াজটি একটু কমাবেন?” এভাবে সামান্য আগ্রহ দেখালে কথোপকথন সহজ হয়। হঠাৎ কোনো অপরিচিত ব্যক্তি এসে কোনো কাজ বন্ধ করতে বললে যে কেউ অস্বস্তি বোধ করবে। তাই কেন বারণ করছেন, তার কারণ বুঝিয়ে বললে তিনি বিষয়টি বুঝতে পারবেন। তখন তিনি ভাববেন না যে আপনি কেবল তার গান বা ভিডিও পছন্দ করছেন না। যদি সংক্ষিপ্তভাবে বিষয়টি শেষ করতে চান, তবে সামাজিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মিশেল রেটস্কির বুদ্ধি অনুসরণ করতে পারেন। তিনি সুন্দরভাবে একটি প্রশ্ন করার কথা বলেছেন—“আপনার কাছে কি হেডফোন আছে? অনেক জোরে শব্দ আসছে। যদি হেডফোনটি ব্যবহার করতেন।” এভাবে বললে মনে হয় এটি একটি সাধারণ সমস্যা এবং দুজন মিলেই এর সমাধান করতে পারেন। অন্য ব্যক্তির ওপর কোনো চাপ পড়ে না। তার কাছে হেডফোন থাকলে তিনি তা কানে দিয়ে নেবেন, আর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর তা না থাকলে বলা যেতে পারে, “আপনি কি দয়া করে আওয়াজটি একটু কমাবেন?”
মানুষের সাধারণ আচরণ নিয়ে বড় কোনো তর্কে জড়ানোর প্রয়োজন নেই। যত বেশি কথা বলবেন, বিষয়টি তত জটিল হয়ে উঠবে। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝগড়া লাগার আশঙ্কা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের পারিবারিক পরামর্শক ক্লডিয়া জনসনের মতে, সংক্ষিপ্ত ও সরল কথা বলাই সবচেয়ে কার্যকর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন হতে পারে, “আপনি কি হেডফোন ব্যবহার করতে পারেন?” কী বলছেন তার চেয়ে বড় বিষয় হলো কীভাবে বলছেন। সর্বদা নম্রভাবে কথা বলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সামনের ব্যক্তি হয়তো বুঝতেই পারেননি যে তার ফোনের আওয়াজে অন্য কারও অসুবিধা হচ্ছে। সাধারণত অধিকাংশ মানুষই বিনয়ী অনুরোধ শুনলে ফোনের ভলিউম কমিয়ে দেন। আর যদি তিনি আপনার কথা না শোনেন? তাহলে চুপচাপ সেখান থেকে সরে যান। অযথা তর্ক করা বা তাকে উপদেশ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যের খারাপ আচরণ আমরা বদলে দিতে পারি না। আমরা কেবল বিনয়ের সঙ্গে নিজের অসুবিধার কথা বলতে পারি। সে যদি না শোনে বা খারাপ ব্যবহার করে, তবে সেটি তার ব্যক্তিত্বই প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনটি টাইম ম্যাগাজিনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।




