ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর একটি অবশেষে দূর হলো। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, টেথারের ১৮৩ বিলিয়ন ডলারের ইউএসডিটি স্টেবলকয়েনের পেছনে পর্যাপ্ত সম্পদ নেই এবং একদিন প্রতিষ্ঠানটি বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে পারে। তবে সম্প্রতি কেপিএমজি'র নিরীক্ষায় সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

বিগ ফোর অ্যাকাউন্টিং ফার্ম হিসেবে পরিচিত কেপিএমজি'র নিরীক্ষকদের একটি দল সুইজারল্যান্ডের একটি গোপন গুহায় কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বর্ণের বারের ওজন বহন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় গোল্ড টোকেনের পেছনে থাকা প্রায় ১৫০ টন স্বর্ণের বারের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পরিশ্রম। টেথারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পাওলো আর্দোইনো বলেন, এটি ছিল একটি ভারী উত্তোলনের কাজ। এই নিরীক্ষা শুধু স্বর্ণের অস্তিত্বই নিশ্চিত করেনি, বরং টেথারের মোট রিজার্ভ তাদের দায় ছাড়িয়ে গেছে ৬.৮ বিলিয়ন ডলার।

অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কাজ করে বলে পরিচিত টেথার কর্পোরেট স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে হয়তো পুরস্কার জিতবে না, তবে কেপিএমজি'র সিলমোহর পাওয়ার পর গণমাধ্যমের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন — কোম্পানিটি এরপর কী করতে চায়? ব্লকচেইন জগতের অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো টেথারও এখন 'ক্রিপ্টো' লেবেলটি ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। আর্দোইনো বলেন, নিজেদের তারা দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিপ্টো কোম্পানি মনে করেন না; তারা এখন নিজেদের ডিজিটাল ডলার এবং ডিজিটাল স্বর্ণের কোম্পানি হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, টেথারের বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ৬৫০ মিলিয়নেরও বেশি।

এই ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে সরকারগুলো বারবার জাতীয় মুদ্রার মান অবমূল্যায়ন করেছে, ফলে নাগরিকরা টেথারের ডলার এবং স্বর্ণের মতো শক্তিশালী সম্পদের দিকে ঝুঁকেছেন। এখন টেথার আর্থিক পরিষেবার বাইরেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করছে এবং নিজেকে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সরবরাহে সক্ষম একটি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করতে চায়। গত দুই বছরে কোম্পানিটি বিকেন্দ্রীভূত যোগাযোগ, কৃষি এবং সৌরচালিত কিয়স্ক নেটওয়ার্কের মতো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যেখানে মাসে কয়েক ডলারের বিনিময়ে অফ-গ্রিড বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

এবার টেথারের লক্ষ্য মৌলিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবা। আর্দোইনো উল্লেখ করেন, এমনকি সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর প্রায় প্রত্যেকের কাছেই একটি মোবাইল ফোন আছে, যেখানে সহজ একটি এআই মডেল চালানো সম্ভব। তার মতে, টেথারের বিদ্যমান গ্রাহকদের অনেকেই যে উন্নয়নশীল বিশ্বে অবস্থান করছেন, সেখানে লক্ষ্য রেখে একাধিক এআই অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা সম্ভব। অবশ্য টেথারের অ্যাপ্লিকেশনগুলো অত্যাধুনিক ফ্রন্টিয়ার মডেল সরবরাহ করবে না। আর্দোইনোর ভাষ্যমতে, স্বাস্থ্য, অর্থ, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন খাতে মৌলিক এআই সরঞ্জাম সরবরাহ করাই উদ্দেশ্য, যাতে যে কেউ দৈনন্দিন জীবনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে।

এই উদ্যোগের ব্যবসায়িক মডেল সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানাননি আর্দোইনো, তবে ধারণা করা যায়, এআই অ্যাক্সেসের জন্য গ্রাহকদের টেথারের স্টেবলকয়েন বা অন্য কোনো ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে মাসে কয়েক ডলার খরচ করতে হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে ব্লকচেইনের মূল প্রতিশ্রুতি পূরণের একটি উপযুক্ত বিবর্তন হবে — বিকেন্দ্রীভূত বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে যে কেউ অংশ নিতে পারবে। বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলো যখন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন এই নেটওয়ার্কগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন আর্দোইনো। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে যে বিশাল মজুরির ব্যবধান সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে, তা যেন সম্পদের ব্যবধানের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার ব্যবধান যোগ করে আরও ভয়াবহ না হয়ে ওঠে।