ইসলামী শিক্ষামতে, নবীদের মধ্যে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে তুলনা করা নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) নিজেও এ ধরনের বিতণ্ডায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁকে নবী মুসার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা উচিত নয় (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১১)। তবে কোরআন-হাদিসে নবীজির বিশেষ মর্যাদাগুলো অস্বীকার করার অর্থ নয়; বরং তিনি নিজেই ওহির মাধ্যমে ছয়টি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন, যা ব্যক্তিগত মূল্যায়ন নয়।
প্রথমত, তাঁকে ‘জাওয়ামিউল কালাম’ অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বক্তৃতার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ইমাম বুখারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থে বহু পৃষ্ঠাজুড়ে বর্ণিত বিষয়গুলো আল্লাহ নবীজির ক্ষেত্রে এক-দুই বাক্যেই প্রকাশের সামর্থ্য দিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর হাদিসগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও গভীর ফিকহি ও নৈতিক শিক্ষায় পরিপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, নবীজি বলেছেন, তাঁকে এমনভাবে সাহায্য করা হয়েছে যে তাঁর শত্রুরা এক মাসের পথ দূরত্ব থেকেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ত (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫২৩)। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের অলৌকিক সহায়তা, যা মুসলিম বাহিনীকে সংখ্যালঘু হয়েও মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রতিপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করত।
তৃতীয়ত, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তাঁর উম্মতের জন্য হালাল করে দেওয়া হয়, যা পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য বৈধ ছিল না—তাদের নিয়ম ছিল তা পুড়িয়ে ফেলা। এটি নবীজির শরিয়তের একটি স্বতন্ত্র বিধান হিসেবে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
চতুর্থত, সমগ্র পৃথিবীকে তাঁর জন্য পবিত্র ও নামাজের স্থান করে দেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীরা কেবল নির্দিষ্ট উপাসনালয়ে নামাজ পড়তে পারতেন, কিন্তু নবীজির উম্মতের জন্য যেকোনো স্থানেই নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়েছে, যা ইসলামের সর্বজনীনতা ও সহজতার বড় দৃষ্টান্ত।
পঞ্চমত, নবীজিকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের রাসুল হিসেবে পাঠানো হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী নবীরা নির্দিষ্ট জাতি বা অঞ্চলের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। সাহাবি জাবিরের বর্ণনায় ‘লাল-কালো সব মানুষের জন্য প্রেরিত’ শব্দে এটি উল্লেখিত (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫২১)। এ কারণে ইসলামের দাওয়াত কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব যুগ ও অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
ষষ্ঠ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁর মাধ্যমেই নবুয়তের ধারাবাহিকতা চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে। তিনি আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী। কোরআনের সুরা আহজাবের ৪০ নম্বর আয়াতে তাকে ‘খাতামুন্নাবিয়্যিন’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যা এই বৈশিষ্ট্যের প্রশ্নাতীত স্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনিই নবুয়তের ধারার চূড়ান্ত ও সমাপ্তিসূচক ব্যক্তিত্ব।




