বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামে সোমবার সকালে ঘটে যাওয়া একটি বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিন সদস্য দগ্ধ হয়েছেন। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও এখনো পর্যন্ত বিস্ফোরণের পেছনে কী ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা পর্যন্ত এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ঘটনার খবর পেয়ে র‍্যাব, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বিস্ফোরণস্থলটি ঘিরে রেখে সেখান থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকার বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান সন্ধ্যায় জানান, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এখনো ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি, তাই বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত পরীক্ষা করে পরবর্তীতে নিশ্চিত মতামত দিতে পারবেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণটি এতটাই বিকট ছিল যে প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকেও তার শব্দ শোনা গেছে। দুধলমৌ গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন সিকদার বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে বিকট শব্দ শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শব্দের উৎসের দিকে এগোতে গিয়ে তিনি দেখেন, মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে। পরে শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে গিয়ে দেখেন, পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি করছেন এবং শাহ আলমের স্ত্রী, মেয়ে ও নাতি দগ্ধ হয়েছেন। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইতি আক্তার (১৮) জানান, সোমবার সকাল ছয়টার দিকে তিনি ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠানে তাঁর ভাগনের পায়ে ব্যথা থাকায় তাকে ব্যায়াম করাচ্ছিলেন। সে সময় তিনি একটি রশির সঙ্গে লাল রঙের তিনটি চিপসের প্যাকেট বাঁধা দেখতে পান। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দেখেন, রশিটির আরেক পাশে একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগ বাঁধা ছিল। কী বিষয় তা দেখার চেষ্টা করার সময় বৃষ্টির কারণে পিচ্ছিল উঠানে ইটে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গেই বিকট বিস্ফোরণ ঘটে এবং তার পায়ে আগুন লাগে। পাশে থাকা তার মা ও ভাগনের শরীরেও আগুন ধরে যায়। আতঙ্কে তারা বাড়ির পাশের তুলাতলা নদীতে ঝাঁপ দেন।

হাসপাতালের সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার আলমগীর হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে এটি হিট বার্ন বলে মনে হচ্ছে। ছেলেটির (ফাহিম) শরীরের প্রায় ১৫ শতাংশ অংশ দগ্ধ হয়েছে, অন্য দুজনের আঘাত তুলনামূলক কম। এটি কেমিক্যাল বার্ন নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে তা এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে তাদের শরীরে কোনো স্প্লিন্টার পাওয়া যায়নি।

ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের একটি বোতল, লাল-কালো সুতা প্যাঁচানো টেপ এবং দুই থেকে চার ইঞ্চি মতো তার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আদিল হোসেন। তিনি বলেন, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো মামলা হয়নি, তবে হবে বলে তিনি জানান।

দগ্ধ তিনজন হলেন হনুফা বেগম (৫৫), তাঁর মেয়ে ইতি আক্তার (১৮) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাতি ফাহিম (১৫)। তাদের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সোমবার সন্ধ্যায় বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তাদের রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহম্মদ, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান ও জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিক ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

ঘটনার পর থেকে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তুলাতলা নদীতীরের এই প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, তাঁদের এলাকায় এর আগে এমন বিস্ফোরণের ঘটনা কখনো ঘটেনি। কীভাবে এবং কেন এই বিস্ফোরণ ঘটল, বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা। তবে পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।