সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের ওপর তৎকালীন সরকারের নির্যাতন ক্রমশ বেড়ে যায়। আন্দোলন যত জোরালো হয়েছে, নির্যাতন তত বৃদ্ধি পেয়েছে—এই চক্রাকারে একপর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালাতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। তৎকালীন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ১৭৭ জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে রায় ঘোষণা করে। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সব গ্রেডে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ এবং কোটা ভিত্তিতে ৭ শতাংশ নিয়োগের বিধান রাখা হয়। নির্বাহী বিভাগকে অবিলম্বে এ নির্দেশনা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এই রায় আন্দোলন প্রশমনে ব্যর্থ হয়। রায়ের দিনও দেশে ১৯ জন ছাত্র-জনতার মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ৭ জন আগে আহত হয়েছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সেই সময় দেশে কারফিউ জারি ছিল এবং মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল।
পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি স্লোগান: 'তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে'। কোটা সংস্কারের রায় এলেও নির্বিচার গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এর আগে ২১ জুলাই ভোরে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন রাস্তার পাশে ফেলে যান আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলামকে, যিনি বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ার একটি বাসা থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয় এবং ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালেও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, যার পর সব ধরনের কোটা বাতিল করা হয়। জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণার পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে নির্বাহী পরিপত্র জারি করা হয়। কিন্তু ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা সেই পরিপত্রের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্ট কোটা পরিবর্তনের পরিপত্রটি বাতিল করে দেন, যার ফলে সব ধরনের কোটা পুনর্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। আপিল বিভাগে শুনানির প্রথম তারিখ ছিল ৪ জুলাই, তবে সেদিন হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি মুলতবি করা হয়। সেই থেকেই আন্দোলন তীব্র হতে থাকে।




