তুরস্ক সফর থেকে ফেরার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিল পরিস্থিতিতে এবার কংগ্রেসে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। গত মঙ্গলবার এই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিংয়ের দাবি তোলা হয়। মূলত, ইরানের সম্ভাব্য হামলা থেকে প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে গিয়ে শতাধিক মানুষকে অজ্ঞাতসারে বিপদের মুখে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করার প্রশ্নও তুলেছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা।
গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পেরেছিল, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করছে এবং এই হুমকিকে তারা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে। এই তথ্য পাওয়ার পরই ট্রাম্পকে এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে সরিয়ে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম এই ঘটনা প্রকাশ করে, পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ঘটনার দিন অর্থাৎ ৮ জুলাই তুরস্ক ত্যাগের আগে হোয়াইট হাউস ঘোষণা করেছিল, প্রেসিডেন্ট এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়েই যুক্তরাজ্যে যাবেন। কাতার সরকারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটি ব্যবহার না করে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই তিনি সফর করবেন বলে জানানো হয়। টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে নির্ধারিত এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতেও দেখা যায়। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে গোপনে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে বিমানবাহিনীর সি-৩২এ উড়োজাহাজে তোলা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি এত গোপনীয়তার সাথে পরিচালিত হয়েছিল যে প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কর্মীরাও বিশ্বাস করেছিলেন, ট্রাম্প তাদের সাথেই এয়ারফোর্স ওয়ানে রয়েছেন। যাত্রার সময় সাংবাদিকদের জানালার পর্দা টেনে রাখতে বলা হয়েছিল।
ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ উড়োজাহাজটি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের ঘাঁটি আরএএফ মিলডেনহলে স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। অন্যদিকে, পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ও সাংবাদিকদের বহর কয়েক মিনিট পর সেখানে পৌঁছায়। পরে আলোকচিত্রীরা এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে ট্রাম্পের নামার ছবি তোলেন। ধারণা করা হচ্ছে, গোপনে তাকে আবার ওই উড়োজাহাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এবং তিনি সেনাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর তিনি কাতারের দেওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজে ওঠেন এবং ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হন।
এই ঘটনায় জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত নেড প্রাইস বলেছেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোয়াইট হাউস নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে বর্তমান প্রশাসন কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ‘নিরেট মিথ্যা’ প্রচার করেছে এবং সাংবাদিকদের অজান্তেই সেই মিথ্যার সহযোগী বানিয়েছে। প্রাইসের মতে, সাংবাদিকদের না জানিয়ে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। নিরাপত্তার কিছু ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ তারা স্বেচ্ছায় মেনে নিতেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কানেটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল এই ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন ও অদ্ভুত’ এবং ‘চরম ভীতিকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, এয়ারফোর্স ওয়ানকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে সেই উড়োজাহাজে থাকা কর্মী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সিএনএনের উপস্থাপক জেক ট্যাপার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, প্রেসিডেন্টের জীবন রক্ষায় আগের সরকারগুলোর পক্ষ থেকেও প্রতারণা করা হয়েছে, তবে কখনোই পুরো এয়ারফোর্স ওয়ানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করার ঘটনা শোনা যায়নি।
সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক হোসে জামোরা বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে সাংবাদিকদের জানানো উচিত ছিল, যাতে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। ট্রাম্প নিজে এই ঘটনা নিশ্চিত করে বলেছেন, তিনি যে বিমানে উড়াল দিয়েছিলেন সেটিই আসলে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কারণ ইরানিরা ওই উড়োজাহাজটিকেই আক্রমণের উপযুক্ত মনে করতে পারত। তবে তিনি এটিকে পুরোপুরি সিক্রেট সার্ভিসের বিষয় বলে উল্লেখ করে বলেন, তারা যা চায় তিনি শুধু তা-ই অনুসরণ করেন।
তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের সময় মার্কিন বাহিনী ইরানে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছিল, ফলে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা বাড়ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পক্ষ থেকে তুরস্কে এমন গভীর হামলা চালানো প্রায় অসম্ভব। কার্নেগি এনডাওমেন্টের ফেলো অঙ্কিত পান্ডা বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে হামলার চেষ্টা চালানো খুবই কঠিন। ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জেফরি লুইস বলেন, আঙ্কারা থেকে উড্ডয়নের সময় সেটিকে নিশানা করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের নেই, তবে রানওয়েতে থাকা অবস্থায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তাত্ত্বিক সম্ভাবনা রয়েছে।
তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস জেফরি মনে করেন, ট্রাম্পকে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, হুমকির বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে গুরুতর তথ্য ছিল। তিনি মনে করেন, এই গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েল থেকে আসতে পারে এবং তারা প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার মতো গুরুতর বিষয়ে খেলা করবেন না। তবে এ ঘটনায় হুমকিটিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।




