সম্প্রতি একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই অর্থাৎ প্রায় ৭৬.৫ শতাংশে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের সন্ধান মিলেছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (এসডিও) পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা বিদ্যমান। বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ১৯টি ব্র্যান্ডের এই নমুনাগুলোর পরীক্ষা চালায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরি। এক বছর মেয়াদি এই গবেষণায় দেশীয় ২৫টি নমুনার ২২টিতে, ভিয়েতনামের দুটি নমুনার উভয়টিতে, থাইল্যান্ডের দুটির একটিতে এবং ভারতের পাঁচটির একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এমনকি পরীক্ষা করা ছয়টি শিশুর টুথপেস্টের চারটিতেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ছিল। দেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে কোনো বাধ্যতামূলক নিয়মনীতি না থাকায় এই কণাগুলো ব্রাশ করার মাধ্যমে পরিবেশ ও মানবদেহে প্রবেশ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ জটিল রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

এই উদ্বেগজনক চিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যিক টুথপেস্টের প্রাকৃতিক বিকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে মানুষের কৌতূহল বাড়ছে। বেকিং সোডা একটি জনপ্রিয় বিকল্প, যা দাঁতের ওপরিভাগের দাগ তুলতে এবং মুখের অম্লীয়ভাব দূর করতে কার্যকর। তবে এতে ফ্লোরাইডের অভাব এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে দাঁতের এনামেল ও মাড়ির ক্ষতি হবার শঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে, নারকেল তেলের অয়েল পুলিং পদ্ধতি বেশ নিরাপদ ও আরামদায়ক মনে হলেও এর জীবাণুনাশক ক্ষমতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সীমিত, তাই এটিকে সহায়ক হিসেবেই গণ্য করতে হবে। বেকিং সোডা ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের মিশ্রণ দাগ ওঠানো এবং দাঁত সাদা করার জন্য শক্তিশালী, কিন্তু উপযুক্ত ফুডগ্রেড পারঅক্সাইড ব্যবহার না করলে এটি মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অনুপযোগী।

লবণ ওপানি মাড়ির প্রদাহ কমাতে পারে এবং জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করলেও এর কণা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। বেন্টোনাইট বা কেওলিন মাটির মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলো কোমল ঘর্ষক হলেও এগুলোর পরিষ্কার করার ক্ষমতার পক্ষে জোরালো ক্লিনিক্যাল প্রমাণ নেই। এসেনশিয়াল অয়েল যেমন পেপারমিন্ট ও টি ট্রি অয়েল মুখে সজীবতা এনে দেয় এবং কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে সরাসরি ব্যবহারে তা মাড়িতে জ্বালা ও বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। সঠিক মিশ্রণ জরুরি।

উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী নিমের ডাল ও মধ্যপ্রাচ্যের মিসওয়াক প্রাকৃতিক বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। গবেষণায় এদের প্লাক-বিরোধী ও জীবাণুনাশক গুণাবলি কিছু আধুনিক উপাদানের কাছাকাছি প্রমাণিত হয়েছে। যদিও সঠিক ব্যবহারের কৌশল না জানলে এগুলোতেও দাঁতের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে এবং মাজনের সব অংশ পরিষ্কার করাও কঠিন। অপরদিকে কাঠকয়লা বা অ্যাক্টিভেটেড চারকোল দ্রুত দাগ তুলতে পারলেও এগুলো অত্যন্ত ঘর্ষণকারী, যা স্থায়ীভাবে এনামেল ক্ষয় করে দাঁতকে হলুদ দেখাতে পারে। এসব প্রাকৃতিক বিকল্পের প্রধান দুর্বলতা হলো, কোনোটিতেই দাঁত ক্ষয়রোধে অত্যন্ত কার্যকরী ফ্লোরাইড নেই। তাই বিশেষজ্ঞরা এগুলোকে পুরোপুরি টুথপেস্টের জায়গায় ব্যবহার না করে মাঝে মাঝে সহায়ক রূপে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। যাদের দাঁতের সমস্যা আছে, তাদের যেকোনো পরিবর্তনের আগে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।