জমিজমার ঝামেলা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা—আইনি এসব বিড়ম্বনায় বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভীত হয় দালাল নামক মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ে। আইনের জটিল ভাষা সাধারণের বোধগম্য না হওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি এর সুযোগ নেয়। এমতাবস্থায় একটি সম্ভাবনাময় ও আস্থাভিত্তিক কর্মধারা হয়ে উঠতে পারে ‘প্যারালিগ্যাল’ পেশা।

প্যারালিগ্যাল কারা? তারা হলেন আইনজীবীদের প্রশিক্ষিত সহায়ক। যদিও তারা স্বয়ং আইনজীবী নন, তবুও জটিল আইনি পরামর্শ সহজ ভাষায় সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল কাজটি সম্পন্ন করেন তারা। তাদের কর্মপরিধি যথেষ্ট প্রশস্ত। গ্রামীণ অঞ্চলে জমির দলিল, খতিয়ান বা পর্চা নিরীক্ষণের পাশাপাশি দেনমোহর ও খোরপোশের হিসাব, জিডি বা এফআইআর প্রণয়নে সহযোগিতা, চুক্তিপত্রের খসড়া তৈরি, পারিবারিক বিবাদ মীমাংসা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানে আইনি সেবাদান—সবখানে পারিলিগ্যালদের কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। তারা কাজ করেন মক্কেল ও আইনজীবীর মাঝে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে, যাতে সাধারণ মানুষ কখনই ভুল তথ্যের জালে আটকে না পড়েন।

এতে আসতে এলএলবি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। এইচএসসি বা যে কোনো বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেই এ পেশা বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে তাতে যোগাযোগের উৎকৃষ্ট দক্ষতা ও প্রাথমিকভাবে সাধারণ আইনের, বিশেষ করে ভূমি আইনের, জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। বিভিন্ন এনজিও বা আইন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে স্বল্পমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা গড়ে তোলা সম্ভব।

মনে করা যাক, আপনার ইউনিয়নে একজন প্রশিক্ষিত পারিলিগ্যাল সেবা দিচ্ছেন। জমিজমা দেখার পাশাপাশি যেকোনো প্রকারের আইনি কাগজপত্রের খসড়া তৈরি বা প্রাথমিক পরামর্শের বিনিময়ে তিনি একটি স্থির সার্ভিস ফি নিচ্ছেন। নির্ধারিত এই মূল্যের বাইরে কোনো অতিরিক্ত পয়সা দাবি তিনি করছেন না। অপর পক্ষে উচিত পরামর্শ দিয়ে এবং অকারণে মামলায় ফেলার প্রতারণা না করে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করছেন। বছরের পর বছর ধরে যেখানে দালালের পেছনে অর্থ ব্যয় করে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়, সেখানে একমাত্র সৎ এক পারিলিগ্যাল সমগ্র ইউনিয়নের সহায়তার দৃশ্যপট পাল্টে দিতে সক্ষম। জনগণের এই গভীর বিশ্বাসই তার জন্য বিরাট আর্থিক প্রাচুর্য ও সামাজিক মর্যাদা বয়ে আনতে পারে।

তবে এই পেশার প্রসার নিশ্চিত করতে হলে সততার বিকল্প নেই। অন্যথায় এটি নত এবং 'দালালি প্যাকেজে' পরিণত হতে বাধ্য। বাংলাদেশে এ পেশাকে সুগঠিত করায় রাষ্ট্রীয় নজরদারি জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, আইন মন্ত্রণালয় বা বার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে একটি 'প্যারালিগ্যাল পরিষদ' গঠনপূর্বক সনদ প্রদান, নির্ধারিত ফি কাঠামো ও কঠোর নৈতিকতা বিধি জারি করা যেতে পারে। নিয়ম ও নীতি মেনে চললে এই পেশায় প্রাথমিক অবস্থায় ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় সম্ভব, যা অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়েও যেতে পারে।

উনত বিশ্বে পারিলিগ্যালদের উপর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো নিরলস নজর রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা কানাডায় কোনো অনৈতিক পথ অবলম্বন করলে তাৎক্ষণিকভাবে সনদ বাতিল করা হয়। সেসকল দেশে তারা সততার সহিত আইনগত গবেষণা ও নথি প্রস্তুতির কাজ করেন, যা তাদের যশ এবং আর্থিক স্বাবলম্বীতা—দুটিই নিশ্চিত করে।