বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন টেরাকোটা শিল্প এবার সমসাময়িক ফ্যাশনের মঞ্চে নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে। বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) ফ্যাশন স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ইবন আহমেদ তাঁর পঞ্চম সেমিস্টারের ফ্যাশন কালেকশন ডেভেলপমেন্ট কোর্সের চূড়ান্ত নকশা হিসেবে এই ব্যতিক্রমী সংগ্রহ উপস্থাপন করেছেন। পোড়ামাটির উষ্ণ বর্ণ, সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং ঐতিহ্যবাহী নকশাকে ভিত্তি করে তিনি একটি সম্পূর্ণ কালেকশন তৈরি করেছেন, যেখানে সংস্কৃতি ও পরিবেশবান্ধব চিন্তাধারাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
নকশাকারের ভাষ্যমতে, এই কালেকশনের মূল লক্ষ্য ছিল টেকসই ফ্যাশনের ধারণার সাথে বাংলার ঐতিহ্যকে সংযুক্ত করা। তাঁর তৈরি প্রতিটি পোশাকেই টেরাকোটার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। প্রথম লুকটিতে দেখা যাচ্ছে পয়সার মতো গোলাকার পোড়ামাটির টুকরো দিয়ে তৈরি একটি ড্রেস, যেখানে জাতীয় পাখি দোয়েল ও শাপলা ফুলের মোটিফ স্থান পেয়েছে। আরেকটি লুকে অফ-হোয়াইট শাড়ির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যধর্মী বডিস বা ব্রেস্টপ্লেট, যা দর্শকের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম। একইসঙ্গে অফ-হোয়াইট পোশাকের ওপর স্তরে স্তরে সাজানো পোড়ামাটির গোলাকার পুঁতি দিয়ে তৈরি ড্রেপড বডিস বা বডি জুয়েলারিও নজর কেড়েছে।
পুরুষদের পোশাকেও টেরাকোটার একই নান্দনিকতা প্রয়োগ করা হয়েছে। একটি সাদা শার্টের সাথে ব্যবহার করা হয়েছে পোড়ামাটির তৈরি ভাস্কর্যধর্মী ব্রেস্টপ্লেট। প্রাচীনকালে যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের বুক রক্ষার জন্য ব্যবহৃত এই উপাদান এখন আধুনিক ফ্যাশনে এক সাহসী শিল্পরূপে পরিণত হয়েছে। ইবন আহমেদ ধাতু বা কৃত্রিম উপাদানের পরিবর্তে পোড়ামাটি ব্যবহার করে বাংলার ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক সিলুয়েটের অভিনব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। আরেকটি লুকে খাদি কাপড়ের তৈরি ঢিলেঢালা, জাপানি কিমোনো-ধাঁচের জ্যাকেট রাখা হয়েছে, যার বাঁ পাশে খাদি কাপড়ের গোলাপের মোটিফ এবং তা থেকে ঝুলে পড়া পোড়ামাটির ছোট পুঁতির লহরি পোশাকটিকে অতিরিক্ত মাত্রা দিয়েছে।
ইবন আহমেদের মতে, টেরাকোটা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মাটি দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। হাতে তৈরি হওয়ায় এতে যন্ত্রের ব্যবহার কম, ফলে কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পায়। এই শিল্প গ্রামীণ কারিগরদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বাংলার লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। বর্তমানে টেকসই ফ্যাশনের ধারায় টেরাকোটার গয়না ও হস্তশিল্পের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে এটিই অন্যতম কারণ।
কালেকশনটিতে ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদানই পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি শুধু ঐতিহ্যের নান্দনিক উপস্থাপন নয়, বরং দায়িত্বশীল ফ্যাশন চর্চার একটি প্রয়াস। টেরাকোটা শিল্পের প্রতি এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে ফ্যাশন জগতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




