বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের তিন স্বনামধন্য বোন—সুচন্দা, ববিতা ও চম্পা—তাঁদের পারিবারিক শিকড়ের টানে সম্প্রতি ছুটে গিয়েছিলেন যশোরের গ্রামের বাড়িতে। গত ২০ জুন ঢাকা থেকে সাতটি গাড়ির একটি বহর নিয়ে রওনা হন এই তিন তারকা। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের ভাই, অবসরপ্রাপ্ত পাইলট ইকবাল ইসলাম, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যরা—সন্তান, জামাতা, বউমা ও নাতি-নাতনিরা। দুই রাত কাটিয়ে ২২ জুন গভীর রাতে তাঁরা আবার রাজধানীতে ফেরেন।
এই ভ্রমণটি ছিল বহুদিনের লালিত পরিকল্পনার ফল। সুচন্দা জানিয়েছেন, দীর্ঘকাল ধরে পরিবারের তরুণ প্রজন্ম তাঁদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি সম্পর্কে গল্প শুনে আসছিল। এবার তারা সেই গল্পের স্থানগুলো স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পায়। সুচন্দার কন্যা লিসা মালিকের কাছে এই সফর এক অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছে। ছোটবেলায় মায়ের কাছে শোনা ঝড়ের পরে আম কুড়ানো, গোলাভর্তি ধানের চিত্র, এবং আকাশে কবুতরের ওড়াউড়ির মতো ঘটনাগুলো যেন হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর সামনে।
সফরকালে সুচন্দা তাঁর পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পরিদর্শন করেন। যশোর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, যেটি একসময় মোমিন গার্লস স্কুল নামে পরিচিত ছিল, তার প্রধান ফটকের সামনে মেয়েকে নিয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে কাটান তিনি। বহু বছর আগের ছাত্রীজীবনের স্মৃতিচারণায় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সুচন্দা বলেন, জীবনের অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর আবার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ফিরে আসার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল ছেলেমেয়ে, জামাতা-বউমা এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে নিজেদের শিকড়কে নতুন করে আবিষ্কার করা, যেন পুরোনো স্মৃতিগুলো পুনর্জীবিত হয়ে ওঠে।
এই তিন বোনের বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। কিন্তু সরকারি চাকুরে বাবা নিজামুদ্দীন আতাইয়ুবের বদলির সূত্রে শৈশবের বেশ কিছু বছর তাঁরা কাটিয়েছেন যশোর শহরে, নানির নামে রাখা ‘রাবেয়া মঞ্জিলে’। অন্যদিকে যশোরের কাশিমপুর ইউনিয়নের বিজয়নগর গ্রামের ‘বিশ্বাসবাড়ি’ হলো তাঁদের দাদাবাড়ি। দাদা ও নানার বাড়ি মিলিয়ে প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী অবস্থানের পরিকল্পনা ছিল। গ্রামের নির্মল প্রকৃতি, আত্মীয়স্বজনদের সান্নিধ্য, শতবর্ষী একটি নিমগাছের ছায়ায় আড্ডা এবং সমগ্র পরিবারের মিলনমেলা এই সফরকে এক বিশেষ মাত্রা দান করে।
তিন বোনের বিজয়নগরে আসার সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় নারী ও বাসিন্দারা তাঁদের একনজর দেখার জন্য ভিড় জমান। কেউ কথা বলেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউবা আবেগে কাছে গিয়ে স্পর্শ করেন। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় আপ্লুত হন তিন শিল্পী। ববিতা বলেন, ‘পরিবারের নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে দাদা-নানার বাড়ি ঘুরে দেখতে পেরে অসাধারণ লেগেছে। যে পরিবেশে আমরা বড় হয়েছি এবং যে গল্প এতদিন বলেছি, তা ওরা নিজের চোখে দেখেছে। এই তৃপ্তি বলে বোঝানো যাবে না।’ চম্পা এই ভ্রমণকে নিছক বেড়ানো নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। পুরো পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়টা তাঁকে ভীষণ আবেগপ্রবণ করে তোলে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সুচন্দা উল্লেখ করেন, সাধারণত বিদেশে থাকা ছোট ভাই দেশে ফিরলে তবেই সবার একসঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার এ আয়োজন সম্ভব হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিন প্রজন্মের সম্মিলনে পারিবারিক ভিটেমাটি, ইতিহাস ও শিকড়ের সাথে নতুন সদস্যদের সম্পর্ক স্থাপনের এই যাত্রা সবার জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।




