মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় তিন দশক ধরে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য জর্ডান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের পর জর্ডানের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা জোরদার করেছে ইরান। তবে জর্ডানের আকাশে নিয়মিত সাইরেন বাজলেও দেশটি মার্কিন উপস্থিতি সীমিত করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতার কারণেই জর্ডান এই সামরিক কার্যক্রম সংকুচিত করতে পারছে না।

জর্ডান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ১৬৫ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন জর্ডানের কর্মকর্তারা। পারস্য উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ কিছু আরব প্রতিবেশীর তুলনায় জর্ডান সম্পদহীন এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। টেম্পল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও ‘জর্ডান: পলিটিক্স ইন অ্যান অ্যাক্সিডেন্টাল ক্রুসিবল’ বইয়ের লেখক শন ইয়োমের মতে, জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বল একটি রাষ্ট্র, যা ছোট এবং আঞ্চলিক হুমকিতে ঘেরা। এই দেশের মহাশক্তিধর পৃষ্ঠপোষকের প্রয়োজন, এবং যুক্তরাষ্ট্র কয়েক প্রজন্ম ধরে সেই ভূমিকা পালন করে আসছে। ইয়োম আরও বলেন, ১৯৫০-এর দশক থেকে জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সহায়তা পেয়ে আসছে, তা অন্য কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

ইরানের হামলায় বিপদে পড়লেও জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে না। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক হাসান আলমোমানি বলেন, ‘জর্ডান কোনো অবস্থাতেই তার কৌশলগত অংশীদারত্ব পরিবর্তন করতে পারে না।’ ইয়োমও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে জর্ডানের নির্ভরশীলতা কমানোর মতো কোনো অর্থবহ দাবি দেশটির ভেতরে নেই।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেয়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইরান মূলত ইসরায়েল ও উপসাগরে থাকা মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করলেও জর্ডানের দিকেও শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। গত রোববার জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে এবং চতুর্থটি জনহীন এলাকায় পড়ে। শুক্রবার মুওয়াফফাক সালতি ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং তৃতীয় একজন নিখোঁজ হন। সপ্তাহের শুরুতে আরও তিনটি হামলায় ডজনখানেক মার্কিন সেনা আহত হন এবং বেশ কয়েকটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে জর্ডানের বিমানঘাঁটিগুলো থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং ইরাকে আক্রমণের মতো কার্যক্রমের ঘাঁটি ছিল এই দেশ। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় চার হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন বলে একটি সংসদীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পেন্টাগনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য উপদেষ্টা গ্রান্ট রামলে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে জর্ডানের অবকাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী এবং তিনি এটিকে একটি স্থলভিত্তিক বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি পর্বে মার্কিন সামরিক বাহিনী বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশ থেকে তাদের কিছু সৈন্যকে জর্ডান এবং ইসরায়েলে সরিয়ে নিয়েছিল। জর্ডানের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এই সংঘাতের বিরোধিতা করলেও ইরানে বিমান হামলা বা ইসরায়েলের পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ। চলতি বছর ওয়াশিংটন জর্ডানে সামরিক সাহায্য ৫০ কোটি ডলার বাড়িয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনীপ্রধান মেজর জেনারেল ইউসেফ হুনাইতি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ড্যানিয়েল জিমারম্যান সামরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।