অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে এই চূড়ায় অভিযান অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি কার্যক্রম। প্রায়শই সেখানে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ২০১৪ সালে একটি ভয়াবহ তুষারধসে প্রাণ হারান ১৬ জন নেপালি শেরপা। এরপর কাজের পরিবেশের উন্নতির দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে সে বছর এভারেস্ট অভিযান স্থগিত হয়ে যায়। তার পরের বছর, ২০১৫ সালের এপ্রিলে, নেপালে ৭.৮ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই ভূমিকম্প ও তুষারধসে দেশব্যাপী প্রায় সাড়ে আট হাজার মানুষ নিহত হন, যার মধ্যে শুধু এভারেস্টের বেস ক্যাম্পেই মারা যান ১৯ জন। টানা দুই বছর এ ধরনের বড় দুর্ঘটনার কারণে এভারেস্টে আরোহণ পুরোপুরি বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভারেস্টকে এত বিপজ্জনক করে তোলে সেখানকার আবহাওয়ার আকস্মিক অবনতি ও পথের দুর্গমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অত্যন্ত উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি, যা মানবদেহের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এভারেস্টের উচ্চতা ২৯ হাজার ৩২ ফুট বা ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার। তবে পানির তলদেশ থেকে হিসাব করলে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বত হলো হাওয়াইয়ের মাউনা কেয়া, যার নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত উচ্চতা ৩৩ হাজার ৪৮০ ফুট বা ১০ হাজার ২০৫ মিটার। তবে এর সিংহভাগ সমুদ্রের নিচে তলিয়ে রয়েছে।

প্রায় ৮ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছালেই উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা ‘অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস’ শুরু হতে পারে। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) তথ্যানুযায়ী, ১২ হাজার ফুট উচ্চতার নিচে থাকলে পর্বতারোহীরা সাধারণত জটিল কোনো সমস্যায় পড়েন না। তবে এর চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠলে গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন হাঁটতে কষ্ট, তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে বুদবুদের শব্দ, বিভ্রান্তি বা জ্ঞান হারানো। উচ্চতাজনিত এই অসুস্থতার মূল কারণ অক্সিজেনের অভাব। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক এরিক ওয়েইস ব্যাখ্যা করেন, যত উঁচুতে ওঠা যায়, বায়ুমণ্ডলের চাপ তত কমতে থাকে। এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে অক্সিজেনের মাত্রা সমতলের তুলনায় মাত্র ৫০ শতাংশ থাকে। আর চূড়ায়, ২৯ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছালে তা কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। বায়ুচাপ ও অক্সিজেনের এই বিশাল ঘাটতি মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

উচ্চতাজনিত অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ওপরে ওঠা বন্ধ রাখা এবং অবস্থার উন্নতি না হলে অন্তত ১ হাজার ৬৪০ ফুট নিচে নেমে আসা উচিত বলে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। গুরুতর অবস্থায় দ্রুত নিচে নেমে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। অক্সিজেনের তীব্র অভাবে রক্তনালি থেকে তরল বের হয়ে ফুসফুসে জমা হলে শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হতে পারে। আর মস্তিষ্কে জমা হলে মানসিক ভারসাম্যহীনতা, কোমা বা মৃত্যু ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, এভারেস্টে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ চরম ক্লান্তি ও নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চূড়ায় পৌঁছানো। তাই অক্সিজেন ও দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চূড়া থেকে নেমে আসা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, এভারেস্টে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হার প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ। সাধারণ পর্বতারোহীদের বেশির ভাগই উচ্চতাজনিত কারণে ভারসাম্য হারিয়ে ওপর থেকে নিচে পড়ে মারা যান। অন্যদিকে, বরফ বা তুষারধসের মতো বিপদে শেরপাদের মৃত্যু বেশি হয়, কারণ তারা পর্বতারোহীদের জন্য বিপজ্জনক পথ তৈরির কাজে দীর্ঘ সময় কাটান। তবে সাধারণ মানুষের তুলনায় শেরপাদের মৃত্যুহার কম। বছরের পর বছর উঁচুতে বাস করায় তাদের শরীরের কোষ কম অক্সিজেনেও দক্ষতার সঙ্গে শক্তি তৈরি করতে পারে। এমনকি তাদের সূক্ষ্ম রক্তনালিতে রক্ত সঞ্চালনও স্বাভাবিক থাকে, যা তাদের পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

উচ্চতায় অসুস্থতা এড়াতে ধীরে ধীরে ওপরে ওঠা ও সতর্ক থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চরম উঁচুতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা চেতনা হারালে তাকে নিচে নামিয়ে আনা ভীষণ কঠিন। এভারেস্টের উঁচুতে পর্বতারোহীরা অসুস্থ হয়ে পড়লে বাঁচানোর প্রধান উপায় হলো কৃত্রিম অক্সিজেন দেওয়া বা দ্রুত নিচে নামিয়ে আনা। এ জন্য ‘গ্যামো ব্যাগ’ নামের এক বিশেষ ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। পাম্প দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে ব্যাগের ভেতরের বায়ুচাপ বাড়িয়ে দিলে অসুস্থ পর্বতারোহী কিছুটা নিচে নেমে আসার স্বস্তি পান। তবে প্রায় ৬ কেজি ওজনের এই ভারী ব্যাগ এত উঁচুতে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব বলে এটি বেস ক্যাম্পেই রাখা হয়।

এত বিপদ ও চরম আবহাওয়ার পরও কিন্তু মানুষ থেমে নেই। কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই প্রথম আমেরিকান নারী হিসেবে ৬ বার এভারেস্ট জয় করেছেন মেলিসা আর্নট। চার্লি লিনভিল প্রথম অঙ্গ হারানো ব্যক্তি হিসেবে এবং নেপালি নারী লাখপা শেরপা রেকর্ড ৯ বার এভারেস্টের চূড়ায় উঠে অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। সূত্র: লাইভ সায়েন্স।