পৃথিবীর বুকে পোকামাকড়ের রাজত্ব কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধারণা প্রচলিত ছিল। চারপাশে তাকালেই বোঝা যায়, লক্ষ কোটি পিঁপড়া থেকে শুরু করে হাজার হাজার প্রজাতির জোনাকি— সব মিলিয়ে এই গ্রহটি আসলে পতঙ্গদের এক বিশাল সাম্রাজ্য। বিজ্ঞানীদের মধ্যে গত ৪০ বছর ধরে একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, পোকামাকড়ের প্রজাতির সংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০ লাখের কাছাকাছি হবে। কিন্তু প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই পুরোনো ধারণাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে।
নতুন এই গবেষণার ফলাফল বলছে, পৃথিবীতে পোকামাকড়ের প্রজাতির সংখ্যা ৬০ লাখ নয়, বরং ১ কোটি ৪০ লাখ থেকে শুরু করে ২ কোটির মতো হতে পারে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই বিপুল সংখ্যক প্রজাতির মধ্যে মানুষের পরিচয় ঘটেছে মাত্র অতি সামান্য কিছু প্রজাতির সঙ্গেই। পতঙ্গদের এই অসামান্য বৈচিত্র্যের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাদের রূপান্তর প্রক্রিয়া। জীবনের বিভিন্ন ধাপে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। যেমন, একটি পতঙ্গ তার জীবন শুরু করে শুঁয়োপোকা হিসেবে, গাছের পাতা খেয়ে বেড়ায়, আর কিছুদিন পরেই রূপান্তরিত হয়ে সুন্দর প্রজাপতি বা মথে পরিণত হয় এবং ফুলের মধু পান করে। একই জীবনে দুটি ভিন্ন আবাস ও খাদ্যাভ্যাস— এই বৈশিষ্ট্যই তাদের এত সফল করে তুলেছে।
পোকামাকড়ের আকার এতটাই ছোট যে তারা সহজেই মানুষের চোখের আড়ালে বিশাল কলোনি গড়ে তুলতে পারে, যেখানে পৌঁছানো বিজ্ঞানীদের জন্যও বেশ কঠিন। টানা চার দশক ধরে ৬০ লাখ প্রজাতির হিসাবটিকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে আসা হচ্ছিল, কারণ এই খুদে প্রাণীদের নিখুঁত পরিসংখ্যান বের করা সত্যিই কঠিন এক কাজ। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো এবং ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের পতঙ্গবিদ ও এই গবেষণার সহ-লেখক রবার্ট কোলওয়েল এই চ্যালেঞ্জের কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আসল সমস্যা হলো, বেশির ভাগ পোকামাকড়ই অত্যন্ত দুর্লভ। বিশাল এলাকা জুড়ে ফাঁদ পাতলেও নিত্যনতুন প্রজাতির দেখা পাওয়া যেতে থাকে।’
গবেষকরা কোস্টারিকার উত্তর-পশ্চিমের এরিয়া দে কনজারভেশন গুয়ানাকাস্টে একটি জঙ্গলে টানা ৬৯ ট্র্যাপ-ইয়ার ধরে ফাঁদ পেতে প্রায় ১৬ লাখ পোকামাকড় সংগ্রহ করেছিলেন। এত বিশাল আয়োজনের পরও তারা নিশ্চিত ছিলেন, ওই জঙ্গলের অনেক পতঙ্গই তাদের ফাঁদে ধরা পড়েনি। বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারা কী কী দেখলেন তা নয়, বরং ঠিক কতটা জিনিস তারা মিস করে গেলেন, তার নিখুঁত পরিসংখ্যান বের করা। এই ধাঁধার জট খুলতে রবার্ট কোলওয়েল, ইউনিভার্সিটি অব কেনটাকির ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল শার্কি এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির জীববৈচিত্র্য বিজ্ঞানী লরা মেলিসা গুজমান মাইক্রোগ্যাস্ট্রিনি নামক পরাশ্রয়ী বোলতার একটি উপগোষ্ঠীর ওপর গভীর মনোযোগ দেন।
এই বোলতাদের জীবনচক্র প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর নিদর্শন। তারা অন্য শুঁয়োপোকার শরীরের ভেতর নিজেদের ডিম পেড়ে আসে। ডিম ফুটে লার্ভা বের হওয়ার পর তারা সেই জীবন্ত শুঁয়োপোকার ভেতরের অংশ খেয়েই বড় হতে থাকে এবং একসময় শুঁয়োপোকাটির শরীর ফুঁড়ে পূর্ণাঙ্গ বোলতা হিসেবে বেরিয়ে আসে। উড়ন্ত এই পতঙ্গগুলোকে বিজ্ঞানীরা এক ধরনের পরিমাপক কাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যাতে তারা বুঝতে পারেন তাদের অন্যান্য ফাঁদগুলো ঠিক কতটা অসম্পূর্ণ। তারা তিন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন— জঙ্গলের কেন্দ্রে ও প্রান্তে তাঁবুর মতো দেখতে ম্যলেইজ ট্র্যাপ এবং সরাসরি শুঁয়োপোকা সংগ্রহ করে ল্যাবে নিয়ে আসা। এই তিন পদ্ধতির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কয়েকটি পরিসংখ্যানগত মডেল দাঁড় করান, যার মাধ্যমে তারা হিসাব করেন, আবিষ্কৃত বোলতার তুলনায় ঠিক কত সংখ্যক বোলতা এখনো লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছে।
এই মডেল থেকেই বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য— আমাদের হিসাবের বাইরে আরও অন্তত ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ প্রজাতির পতঙ্গ পৃথিবীতে লুকিয়ে আছে। লরা মেলিসা গুজমান জানিয়েছেন, এই অজানা প্রজাতিগুলোর বেশির ভাগই আকারে খুব ছোট, বিরল এবং অত্যন্ত বিশেষায়িত। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, একই জঙ্গলের ভেতর ফাঁদ পাতার পরও তাদের খুঁজে পাওয়া ৭৫ শতাংশ পরাশ্রয়ী বোলতা কেবল তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটিতেই ধরা পড়েছিল। অর্থাৎ, এদের আচরণ ও বাসস্থান এতটাই নির্দিষ্ট যে, কেবল এক ধরনের ফাঁদ পাতলে এদের অস্তিত্ব টেরই পাওয়া যাবে না।
গুজমানের মতে, এদের অনেকেই হয়তো অন্য পোকার শরীরে নিজেদের জীবনচক্র শেষ করে। অর্থাৎ, এরা এমন এক খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ, যার সম্পর্কে মানুষের এখনো কোনো ধারণা নেই। আবার কিছু পোকা হয়তো জঙ্গলের একদম মগডালে বা ক্যানোপিতে বাস করে, যেখানে বিজ্ঞানীদের পৌঁছানোর সুযোগ প্রায় নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রাণীগোষ্ঠী এই পোকামাকড়ের সংখ্যা যদি অনুমানের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি হয়, তবে তা জীববৈচিত্র্য নিয়ে এত দিনের জানাশোনাকে পুরোপুরি বদলে দেবে। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্বজুড়ে দ্রুত হারে পোকামাকড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নতুন এই বিশাল সংখ্যার অনুমান বিজ্ঞানীদের বাকি পতঙ্গগুলোকে রক্ষা করার কাজে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে। গুজমানের ভাষায়, ‘কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব সম্পর্কে না জানলে আমরা তাকে রক্ষা করতে পারব না। তাই আমাদের এই সুন্দর গ্রহের জীববৈচিত্র্যকে বুঝতে হলে, ঠিক কতগুলো প্রাণী এখানে বাস করে, তা জানাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।’




