হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা মানেই ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু তার সর্বশেষ ছবি ‘দ্য ওডিসি’ কেবল প্রেক্ষাগৃহেই সাড়া জাগায়নি, বরং সৃষ্টি করেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঢেউ। এই ছবি দেখার পর দর্শক শুধু হল থেকে বের হচ্ছেন না, দৌড়াচ্ছেন বইয়ের দোকানে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠকহৃদয়ে স্থান করে নেওয়া গ্রিক মহাকাব্য ‘ওডিসি’ পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। যুক্তরাজ্যে নোলনের সিনেমাটি মুক্তির পর থেকে হোমারের এই অমর রচনা এবং গ্রিক-রোমান পুরাণ বিষয়ক বইয়ের চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই সহস্র বছরেরও পুরনো গল্প যেন নতুন করে খুঁজে পাচ্ছে আধুনিক পাঠকসমাজকে।

ছবিটি মুক্তির প্রথম চার সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাজ্যে ‘দ্য ওডিসি’র ছাপা সংস্করণের বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১,৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ-আমেরিকান গবেষক এমিলি উইলসনের ২০১৭ সালের আধুনিক অনুবাদটি সবচেয়ে বেশি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ বইয়ের দোকান চেইন ওয়াটারস্টোনস জানিয়েছে, এই সংস্করণটির বিক্রি এক হাজার শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং প্রতি সপ্তাহে এর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। শুধু ‘ওডিসি’ নয়, পুরো পুরাণের জগতই যেন ফিরে আসছে নোলনের এই চলচ্চিত্রের প্রভাব শুধু একটি বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হোমারের ‘ইলিয়াড’, ম্যাডেলিন মিলারের ‘সার্সি’, মার্গারেট অ্যাটউডের ‘দ্য পেনেলোপিয়াড’ ইত্যাদি বইয়ের বিক্রিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অডিওবুকের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জনপ্রিয় অডিও প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাই জানিয়েছে, ‘ওডিসি’র বিভিন্ন অনুবাদ খোঁজার হার বহুগুণ বেড়ে গেছে।

গ্রিক পুরাণের কাহিনিগুলোতে রয়েছে যুদ্ধ, প্রেম, প্রতিশোধ, বিশ্বাস, বুদ্ধি, সাহস এবং মানবীয় দুর্বলতার এক চিরন্তন সংমিশ্রণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নোলনের সিনেমা নতুন প্রজন্মকে কেবল এক চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতাই দেয়নি; বরং এমন এক সাহিত্যজগতের দরজা খুলে দিয়েছে, যেখানে হাজার বছর আগের গল্পও আজকের মানুষের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করছেন, এই আগ্রহ ভবিষ্যতে গ্রিক ভাষা, ল্যাটিন সাহিত্য এবং ধ্রুপদি সভ্যতা নিয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৩ সালে ‘ওপেনহাইমার’এর অসাধারণ সাফল্যের পর ‘দ্য ওডিসি’ নোলানের আরেকটি বড় অর্জন। ছবিতে কিংবদন্তি বীর ওডিসিউসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। তার স্ত্রী পেনেলোপের চরিত্রে রয়েছেন অ্যানা হ্যাথাওয়ে এবং তাদের ছেলে টেলিম্যাকাসের ভূমিকায় দেখা গেছে টম হল্যান্ডকে। ছবিটি মুক্তির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসে টানা দুই সপ্তাহ শীর্ষ স্থান ধরে রাখে এবং বিশ্বজুড়ে আয় করে শত শত মিলিয়ন ডলার। প্রশংসার পাশাপাশি ছবিটি সমালোচনারও ঊর্ধ্বে নয়। হোমারের ‘ওডিসি’র সুপ্রশংসিত আধুনিক অনুবাদক এমিলি উইলসন মনে করেন, নোলনের চিত্রনাট্যে মূল মহাকাব্যটির মানসিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক গভীরতার অনেকাংশই অনুপস্থিত। একই মত পোষণ করেন ইতিহাসবিদ মেরি বিয়ার্ডও। তার মতে, মূল কাহিনির সূক্ষ্ম আবেগ, রসবোধ এবং দার্শনিক প্রশ্নগুলো ছবিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু দুজনেই স্বীকার করেছেন, নোলানের এই চলচ্চিত্র নতুন করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হোমারের জগতে ফিরিয়ে এনেছে, এটাই তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

সিনেমা অনেক সময় শুধুই বিনোদন দেয়। আবার কখনও একটি পুরো প্রজন্মকে নতুন কোনো বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করে দেয়। ‘দ্য ওডিসি’ সেই বিরল উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে একটি সিনেমা দুই হাজার বছরের পুরোনো সাহিত্যকে পুনরায় সমসাময়িক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে মনোযোগের সময় ক্রমশ কমছে, সেখানে একটি চলচ্চিত্রের প্রেরণায় মানুষ বই হাতে তুলে নিচ্ছে— এটি নিঃসন্দেহে সংস্কৃতি ও সাহিত্যের জন্য এক আশাজাগানিয়া খবর। ট্রেন্ড পরিবর্তিত হয়, প্রযুক্তি বদলায়, দর্শকের রুচিও বদলায়। কিন্তু কিছু গল্প কখনও পুরনো হয় না। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ প্রমাণ করেছে, হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যও নতুন প্রজন্মকে সমানভাবে মুগ্ধ করতে পারে, যদি তা নতুন ভাষায়, নতুন দৃষ্টিকোণে তুলে ধরা যায়। আর সেই কারণেই গ্রিক পুরাণের এই চিরন্তন গল্পগুলো আবারও ফিরে আসছে পাঠকের বইয়ের তাকে, বইয়ের পাতায় এবং আলে ওনার কেন্দ্রবিন্দুতে।