ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা ওমর সানী ও মৌসুমীর বিয়ে নিয়ে নব্বইয়ের দশকে দর্শক-ভক্তদের মধ্যে ছিল রীতিমতো আগ্রহ। তবে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করে নয়, বরং নিভৃতে পরিবারের ঘনিষ্ঠজনের উপস্থিতিতে ১৯৯৫ সালের ৪ মার্চ তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সে বিয়ের খবর দীর্ঘদিন গোপন রাখা হলেও, দেড় বছর পর আয়োজিত এক বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঢাকার মানুষের কাছে পরিণত হয় এক বিস্ময়কর স্মৃতিতে। ১৯৯৬ সালের ২ আগস্ট সেই আয়োজনের আজ তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে নায়ক ওমর সানী ফিরে দেখলেন তাঁদের প্রণয়, বিয়ে আর সংবর্ধনার সেই দিনগুলির কথা।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মহরত অনুষ্ঠানেই ওমর সানী ও মৌসুমীর প্রথম দেখাটি হয়। তখন ওমর সানীর একটি সিনেমা রিলিজ করলেও মৌসুমীর অভিনয় যাত্রা সদ্যো আরম্ভ। পরিচালক শেখ নজরুল ইসলাম একদিন মৌসুমীর মোহাম্মদপুরের বাসায় নতুন ছবির প্রস্তাব নিয়ে যান ওমর সানীকে সঙ্গে নিয়ে, আর সেখানেই দুজনের মধ্যে হয় প্রথম আলাপচারিতা। তবে ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে বিনয়ী মৌসুমী সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে খানিক হতাশ হয়েই ফিরতে হয় ওমর সানীকে।
পরে ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তি পাওয়ার পর প্রযোজকদের প্রচেষ্টায় ‘দোলা’ ছবিতে তাঁরা প্রথমবারের মতো জুটি হিসেবে ক্যমেরার সামনে দাঁড়ান। সিলেটের শুটিংয়ে প্রথম দিকে দুজনের মধ্যে কিছু মনোমালিন্যও তৈরি হয়, কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেই দূরত্বই একসময় পরিণত হয় ভালো লাগার সম্পর্কে। ওমর সানী স্বীকার করেরেন, মৌসুমীর ব্যক্তিত্ব, তাঁর পারিবারিক আবহ ও আচরণবিধি তাঁকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছিল। ‘আত্ম অহংকার’ ছবির শুটিং স্পটে সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে। এক নবেম্বরে মৌসুমীর জন্মদিনের দিন ওমর সানী তাঁর মায়ের দেওয়া সাড়ে তিন-চার ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন খুলে পরিয়ে দেন প্রিয়ার গলায়, যা মৌসুমীকে গভীরভাবে চমকে দিয়েছিল।
ঢাকায় ফিরে একদিন ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা। মৌসুমী হঠাৎ ঘোমটা পরে ওমর সানীর বাসায় হাজির হন এই জানিয়েযে, তিনি নাকি সানীকে নিয়ে একটি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। এফডিসিতে যাওয়ার আগে তাই তার সঙ্গে একবার দেখা করতে আসা। সেই মুহূর্তটি ওমর সানীর মন বদলায়, তিনি বুঝতে পারেন তাঁদের এই বন্ধন আর নিছক সহশিল্পীর সীমায় আবদ্ধ নয়। মৌসুমীকে ভালোবাসার কথা নিজের মায়ের কাছেও গোপন রাখেননি নায়ক। এমনকি একটি ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে অকপটে ঘোষণা দেন, তিনি মৌসুমীকে ভালোবাসেন, যদিও অন্যজনের মনব সম্পর্কে অবগত নন। এই সাহসী সাক্ষাৎকার পড়ে মৌসুমী হতভম্ব হলেও ওমর সানী নিজের অবস্থান আঁকড়ে থাকেন।
ইতোমধ্যে ওমর সানীর মা ও মৌসুমীর নানির মধ্যে এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, দুজনেই চাইছিলেন সম্পর্কটি বিবাহে পৌঁছাক। কিন্তু মৌসুমীর মা প্রথামিকভাবে সিনেমা জগতের কারও সঙ্গে মেয়ের বিয়েতে আপত্তি জানালেও, পরবর্তীকালে তিনিও তাঁর মত বদলান। একই সাথে দুই পরিবারের মহাখালী ডিওএইচএসের বসতিও হয় কাছাকাছি। মৌসুমীদের ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে ওমর সানীদের ৩১ নম্বর রোডের বাসাটি ছিল অল্প দূরত্বে।
১৯৯৫ সালের ৪ মার্চের দিনটি আঁচরল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দেয়। মৌসুমী ও তার নানি একেবারে ওমর সানীদের বাসায় উপস্থিত হয়ে সানীর মাকে বললেন, এই মূহুর্তেই কাজি ডেকে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। সেদিনই কাজি আসেন আর দুই পরিবারের ঘনিষ্ট সদস্য ও দুইজন বিশ্বস্ত চলচ্চিত্র পরিচালকের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় চুপিসারের এই বিবাহ অনুষ্টান। কিন্তু অভিনয় ক্যারিয়ারের স্বার্থে এই বিয়ের খবর আপাতত গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেন দুই তারকাই।
কিছু মাস পরে যখন খবর আসে মৌসুমী গর্ভবতী, তখন আর বিষয়টি লুকোনো যায়নি। কেউ কেউ আরও বিলম্বের পরামর্শ দিলেও তাঁরা তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। শেষ পর্যন্ত চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আয়োজন করা হয় সেই স্মরণীয় বিবাহোত্তর সংবর্দনার।
২ আগস্ট ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সেই আয়োজন ছিল রীতিমতো জাঁকজমকপূর্ণ। মৌসুমীর গায়ে হলুদের আয়োজন হয় বাসার ছাদে, আর ওমর সানীর নিজের বাড়িতে। মৌসুমীর আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, বর ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আসুন, আর স্বামী সে ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। পরদিন বরযাত্রা শুরু হয় ওমর সানীকে নিয়ে। তার ঘোড়ার গাড়ির পেছনে বাপ্পারাজ, অমিত হাসানের মতো স্বনামধন্য তারকা এবং আরও ১১৭টি গাড়ির এক বিশাল বহর যোগ দেয়। মহাখালী ডিওএইচএস থেকে তৎকালীন শেরাটন হোটেল পর্যন্ত পৌঁছানো সেই দীর্ঘ গাড়ির বহরের চাপে রাজধানীর সড়কে তীব্র যানজট লেগে গিয়েছিল, যা সে সময়কার দর্শকদের কাছে ছিল এক বিস্ময়। ওমর সানী বর্ণনা করেন, তিনি যখন বিজয় সরতিতে ঘোড়ার গাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর বহরের শেষ গাড়িটির অবস্থান ছিল মহাখালীর বাসার সামনে।


