বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল নিজের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে। ছোটবেলায় সিনেমায় অভিনয়ের কোনো আগ্রহ ছিল না তাঁর; বরং বড় বোন সুচন্দাকে শুটিংয়ের কষ্ট করতে দেখে তিনি অভিনয় থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। তবে জহির রায়হানের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারেননি তিনি। প্রথমে ‘সংসার’ ছবিতে অভিনয় করেন, যেখানে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘সুবর্ণা’। পরে উর্দু ছবি ‘জ্বলতে সুরাজ কে নিচে’র সময় ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরীর স্ত্রীর পরামর্শে ‘ববিতা’ নামটি গ্রহণ করেন।

বাংলা ছবিতে নায়িকা হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় রাজ্জাকের বিপরীতে। প্রথম রোমান্টিক দৃশ্যের কথা স্মরণ করে তিনি হেসে বলেন, তাকে রাজ্জাক জড়িয়ে ধরবেন শুনে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। প্রথম পারিশ্রমিক ১২ হাজার টাকা দিয়ে তিনি একটি টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন। সেই গাড়ি দেখাতে হাসপাতালে মায়ের কাছে গিয়ে তিনি জানতে পারেন মা আর নেই—এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন।

দেশীয় চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও ডাক আসে। সেই সুযোগ এনে দেন সত্যজিৎ রায়, তাঁর ‘অশনি সংকেত’ ছবির মাধ্যমে। প্রথমে কলকাতা থেকে চিঠি পেয়ে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ফোন এলে কলকাতায় যান। সত্যজিৎ রায়ের সাথে প্রথম সাক্ষাতে তিনি প্রচুর মেকআপ করে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরিচালক তাকে মেকআপ ছাড়া অডিশনে আসতে বলেন। অডিশন শেষে সত্যজিৎ রায় ‘ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। শুটিংয়ের আগে পরিচালক তাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন; একবার ববিতা পান্তাভাত খেয়ে মোটা হওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে জানালে সত্যজিৎ রায় তাকে তা না করতে বলেন।

বাংলাদেশের পরিচালকদের মধ্যে আমজাদ হোসেনের নাম আলাদা করে উল্লেখ করেন ববিতা। তাঁর ভাষায়, তিনি গ্রামভিত্তিক ছবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বানাতেন। কথার ফাঁকে তিনি ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘কসাই’, ‘সুন্দরী’-এর মতো ছবির নাম উল্লেখ করেন। সহশিল্পীদের মধ্যে তাঁর প্রথম পছন্দ রাজ্জাক, আর রোমান্টিক জুটির কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জাফর ইকবালের নাম বলেন।

প্রায় ২৭৫টি ছবিতে অভিনয় করা ববিতা কয়েকটি ছবি প্রযোজনা করলেও পরিচালনা করেননি। এখন আর নিয়মিত অভিনয় করেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের গল্পগুলো তাঁর ভালো লাগে না। তবে অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি; তিনি বলেন, ‘যদি কোনো সময় ভালো গল্প পাই, ভালো চরিত্র পাই, অবশ্যই করব। আমি মনে করি, একজন শিল্পীর শেষ বলে কোনো কথা নেই।’

সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমি ববিতা হয়েছি আমার প্রিয় দর্শকবৃন্দের জন্য। আপনারা আমাকে এত ভালোবেসেছেন বলেই আমি এই জায়গায় পৌঁছেছি।’ শৈশবে মায়ের কাছ থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নাচ, আবৃত্তি ও সংস্কৃতিচর্চার যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, সেই পরিবেশেই তিনি বড় হয়েছেন। যে মেয়েটি একদিন বলেছিল ‘আমি কোনো দিন সিনেমা করব না’, সময়ের পরিক্রমায় সেই মেয়েটিই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক অনিবার্য নাম।