সাহিত্যজগতে হোমারের ‘দি অডিসি’ প্রায় তিন হাজার বছর ধরে একটি অমর সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। বাস্তুচ্যুত রাজা ওডিসিউসের কাহিনি, যিনি ইথাকায় ফিরে যাওয়ার পথে রাগান্বিত দেবতা ও সমুদ্রদানবদের মোকাবিলা করেছিলেন, তা আজও পাঠকদের মুগ্ধ করে। শুধু ইংরেজি ভাষায় এর অন্তত ৬০টি অনুবাদ রয়েছে এবং ক্রিস্টোফার নোলানের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রসহ তিন ডজনেরও বেশি সিনেমা নির্মিত হয়েছে এই মহাকাব্যকে ভিত্তি করে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—ট্রোজান হর্সের কৌশল উদ্ভাবনকারী এই রাজা কি প্রকৃতই রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, নাকি তিনি পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত? আধুনিক পণ্ডিতদের অনেকে এই মহাকাব্যকে নিছক লোককথা হিসেবে দেখলেও, সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো ভিন্ন গল্প বলছে।
ইথাকার পাহাড়ি অঞ্চলে কাজ করা প্রত্নতাত্ত্বিকরা এমন প্রমাণ পেয়েছেন যা থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকালের মানুষ এই কাহিনিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখত। মাউন্ট এক্সোগির পাথুরে চূড়ায় তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন ২ হাজার ৪০০ বছরের পুরোনো এক বিশাল অভয়ারণ্যের ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ‘স্কুল অব হোমার’ নামে পরিচিত এই স্থানে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে খননকাজ চালানো হলেও সম্প্রতি এটি ‘দি ওডিসি’র সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। গ্রিসের ইউনিভার্সিটি অব আইওনিনার প্রত্নতাত্ত্বিক জিয়ান্নোস জি. লোলস ২০১৮ সাল থেকে এই সাইটে খননকাজ পরিচালনা করছেন। গত গ্রীষ্মে গ্রিক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়, যার মধ্যে রয়েছে একটি বিশাল আনুষ্ঠানিক হল, একটি ওয়াচটাওয়ার এবং মাইসেনিয়ান রীতিতে নির্মিত একটি জলাধার।
স্থানীয়দের ধারণা ছিল এই ধ্বংসাবশেষ হয়তো ওডিসিউসের প্রাসাদের ভিত্তি। তবে ড. লোলস জানান, টিকে থাকা অংশগুলো যে ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের—ওডিসিউসের ভ্রমণের সময়কাল—তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও এই ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন কবিতা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে এক সেতু তৈরি করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই স্থানের নাম দিয়েছেন ‘ওডিসেইয়ন’, যার সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর কাছাকাছি। অর্থাৎ হোমারের মহাকাব্য রচনার প্রায় ৫০০ বছর পর এবং নায়কের কল্পিত যাত্রার এক সহস্রাব্দ পর এটি নির্মিত হয়েছিল।
খননকাজে ড. লোলস ও তাঁর সহকর্মীরা অসংখ্য প্রত্নবস্তু উদ্ধার করেছেন—চকচকে কালো পেয়ালা, গয়না, প্রার্থনার পাত্র এবং হাজার হাজার ভাঙা মৃৎশিল্পের টুকরো। লাতিন ও ধ্রুপদি গ্রিক ভাষায় খোদাই করা ছাদের টাইলস প্রমাণ করে এটি ছিল একটি সর্বজনীন কেন্দ্র। এখানে হেলেনিস্টিক ও রোমান বিশ্বের বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের ১০০টিরও বেশি ব্রোঞ্জ ও রুপার মুদ্রা পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রিস্টিনা মারাবিয়ার মতে, এটি দূরদূরান্ত থেকে নাবিক, বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের ক্রমাগত যাতায়াতের প্রমাণ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো তিনটি আলাদা টাইলসে কাদামাটির ওপর ‘ওডিসিউস’ নাম খোদাই করা। একটির অর্থ ‘ওডিসিউসের’—যা স্থানটির মালিকানা নির্দেশ করে, অন্যটিতে ‘ওডিসিউসকে’ লেখা, যা রাজাকে সরাসরি প্রদত্ত উপহার।
শুধু বীর ওডিসিউসই নন, এই আচার-অনুষ্ঠানে নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে মনে করা হয়। খননকাজে পাওয়া কয়েক ডজন স্পিন্ডল হোরল ও তাঁতের ওজন থেকে ড. মারাবিয়া অনুমান করেন, নারীরা সম্ভবত ওডিসিউসের চতুর স্ত্রী পেনেলোপেকে শ্রদ্ধা জানাতেন, যিনি পাণিপ্রার্থীদের দূরে রাখতে তাঁত ব্যবহার করতেন।
হোমারের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্কেরও অবসান নেই। ভূমধ্যসাগরের সাতটি শহর নিজেদের হোমারের জন্মস্থান দাবি করে লড়াই করেছে। মূলধারার শিক্ষাবিদদের মতে, হোমার কোনো একক ব্যক্তি ছিলেন না; খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে গ্রিস ফিনিশীয় বর্ণমালা আত্মস্থ করার সময় মুখে মুখে প্রচলিত গাথাগুলো একত্রিত হয়ে এই মহাকাব্যের জন্ম। তবে ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত ডেইজি ডানের মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন, হোমার প্রকৃতই একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন—একজন দক্ষ সম্পাদক যিনি নিখুঁতভাবে মহাকাব্যগুলো সাজিয়েছিলেন।
ওডিসিউসের গন্তব্য নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। প্রাচীন ভূগোলবিদ এরাতোস্থেনেস পাঠকদের ‘দি অডিসি’ আক্ষরিক অর্থে নিতে নিষেধ করেছিলেন। মহাকাব্যে ইথাকাকে পশ্চিমের নিচু দ্বীপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবের ইথাকা পাহাড়ি এবং সেফালোনিয়ার পূর্বে। গবেষক জেমস ডিগল ও জন আন্ডারহিলের মতে, মূল গ্রিক পাঠে ইথাকাকে কখনোই দ্বীপ বলা হয়নি, বরং এটি উপদ্বীপের ইঙ্গিত দেয়। তবে ড. লোলস মনে করেন, আধুনিক ইথাকাই হোমারের সত্যিকারের ইথাকা; ‘নিচু ও পশ্চিমে’ বর্ণনাটি কবিতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা, আক্ষরিক মানচিত্র নয়।
সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মাটির নিচ থেকে পাওয়া নিদর্শন—ওডিসিউসের প্রতি শপথ খোদাই করা একটি ক্লে প্রেয়ার মাস্ক, ১৯০৪ সালে পাওয়া ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি এবং খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর শেষের দিকের একটি ডিক্রি, যেখানে ‘ওডিসেইয়া’ উৎসবের উল্লেখ রয়েছে। ড. লোলসের মতে, এই মিথগুলো মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এক ইতিহাস, যা কেবল খুঁড়ে বের করার অপেক্ষায়।




