যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা ব্যাপকভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে রাজ্যটির বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৯ শতাংশে। অথচ ২০২২ সালে এই হার ছিল ২.৫ শতাংশ, যা ছিল মহামারী-পরবর্তী সময়ের সর্বোচ্চ। এই ধীরগতি মূলত তিনটি কারণে ঘটেছে বলে জনমিতিবিদরা মনে করছেন।
প্রথমত, অন্যান্য রাজ্য থেকে ফ্লোরিডায় আগমনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অংশ থেকে মাত্র ২২ হাজার মানুষ ফ্লোরিডায় এসে বসতি স্থাপন করেছেন, যেখানে মহামারীকালীন ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে গড়ে প্রতি বছর ২ লাখ ৮ হাজার মানুষ আসতেন। এই পতনের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লোরিডায় ক্রমবর্ধমান আবাসন খরচ, বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নতুন বাসিন্দাদের আসা নিরুৎসাহিত করছে।
দ্বিতীয়ত, ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ফ্লোরিডায় মৃতের সংখ্যা জন্মের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই 'প্রাকৃতিক হ্রাস' অন্য রাজ্যেও দেখা গেলেও, ফ্লোরিডার জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ রাজ্যটি আর আগের মতো অভিবাসীদের জন্য চুম্বক হয়ে নেই। তৃতীয়ত, ২০২৫ সালে বিদেশ থেকে ফ্লোরিডায় অভিবাসনের হারও তীব্রভাবে কমেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই কঠোর অভিবাসন নীতি এই পতনের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের পর থেকে ফ্লোরিডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল বিদেশি অভিবাসন, কিন্তু সেটিও এখন হুমকির মুখে।
এই জনমিতিক পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। ২০২৬ সালের জুন মাসের শুরুর দিকে রাজ্যের আইনসভা নভেম্বরের নির্বাচনে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য গৃহস্থালির সম্পত্তি কর কমানো। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান বাড়ির মালিকদের জন্য 'হোমস্টেড ট্যাক্স ছাড়' শুরু হবে ২০২৭ সালে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার থেকে, যা ২০২৮ সালে বেড়ে হবে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং তারপর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নতুন বাসিন্দাদের জন্য এই ছাড় শুরুতে মাত্র ৫০ হাজার ডলার থাকবে এবং চার বছর পর তা বেড়ে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার হবে।
প্রস্তাবটির সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে কর রাজস্বের এই ঘাটতি নতুন বাসিন্দাদের আগমনের মাধ্যমে পূরণ হবে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা বিবেচনায় এই যুক্তি দুর্বল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডেস্যান্টিস সম্প্রতি ২০২৬ সালের জন্য একটি নতুন কংগ্রেসনাল মানচিত্র অনুমোদন করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০২০ সালের পর থেকে রাজ্যের ভেতরে অসম অভিবাসনের কারণে এই নতুন মানচিত্র প্রয়োজন। তবে জনমিতি বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধীরগতি স্থানীয় ও রাজ্য সরকারের বাজেটের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কোন অঞ্চলে এখনও বৃদ্ধি হচ্ছে? বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যে সব কাউন্টি মহামারীকালে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছিল, সেগুলোর বৃদ্ধি এখন ব্যাপকভাবে কমেছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশের বৃহত্তম অবসরপ্রাপ্তদের আবাসস্থল 'দ্য ভিলেজেস'-এর অবস্থান সামটার কাউন্টির বৃদ্ধির হার ২০২২ সালে ছিল ৭.৪ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ২.৩ শতাংশে। নেপলস শহর নিয়ে কলিয়ার কাউন্টির বৃদ্ধির হার ৩.৬ শতাংশ থেকে কমে ০.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, জ্যাকসনভিল মহানগরীর অন্তর্গত সেন্ট জনস কাউন্টি ৩.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রাজ্যের শীর্ষ স্থান দখল করেছে। এই কাউন্টিতে পরিবার ও শিশুদের উপস্থিতি বেশি এবং স্কুলের মান ভালো বলে জানা গেছে। অরল্যান্ডো থেকে এক ঘণ্টা উত্তরে অবস্থিত ওকালা শহর নিয়ে ম্যারিয়ন কাউন্টির বৃদ্ধি ২০২৫ সালে ছিল ৩.৪ শতাংশ, যা ২০২২ সালের চেয়েও বেশি। সেখানে গড় বাড়ির দাম রাজ্যের গড় প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার ডলারের তুলনায় মাত্র ২ লাখ ৭৫ হাজার ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লোরিডা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে এমন একটি রাজ্য হিসেবে দেখে আসছে যা জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে চালিত করে। কিন্তু বর্তমান তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে এই ধারা ভেঙে যেতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কিছু কাউন্টির বৃদ্ধি আবার বাড়লেও, সামগ্রিকভাবে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধীরগতি সরকারি নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন জনমিতিবিদরা।

