আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার এই দাম দেখা গেলেও পরে কিছুটা কমে আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর তেল সরবরাহ-সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দাম ততটা বাড়েনি যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল—২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১২৮ ডলার ও ২০০৮ সালে ১৪৬ ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করেনি। কিন্তু বর্তমান উত্তেজনা বাড়লে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখন যে কয়েকটি কারণে দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেই সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জেপি মরগানের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার কারণে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় থেমে গেছে। বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠানো হচ্ছে। তবে ক্যাপিটাল ইকোনমিকস সতর্ক করেছে, সেই বিকল্পও এখন ঝুঁকির মুখে। বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির আরেকটি পথ কার্যত বন্ধ। জেপি মরগানের নাতাশা কানেভা জানান, সৌদি আরব সুয়েজ খাল দিয়ে তেল পাঠাতে পারলেও বড় জাহাজ চলাচলের গভীরতার সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে যেতে সময় লাগে আট সপ্তাহ—স্বাভাবিকের দ্বিগুণ।
বিমা জটিলতাও বাড়ছে। লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলএমএ) প্রশ্ন তুলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হওয়া জাহাজ ভবিষ্যতে বিমা পাবে কি না। ইরান প্রতি ব্যারেল তেলে ১-২ ডলার টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে। এলএমএর খসড়ায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইরানকে টোল দেওয়া বেআইনি; কোনো জাহাজ টোল দিলে তার পুরো বিমা বাতিল হতে পারে। ইরান হুমকি দিয়েছে, টোল না দিলে তারা জাহাজে হামলা চালাবে। ফলে নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, রাশিয়াও বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকটের বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ও কাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জেরে রাশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশটি ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের অ্যান্ডি লিপোর মতে, নিষেধাজ্ঞার আগে রাশিয়া প্রতিদিন ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করত, যা বিশ্বের মোট ডিজেল রপ্তানির প্রায় ১২ শতাংশ। কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের হামলায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে—কাসপিয়ান পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে না-ও আসতে পারে।
বৈশ্বিক তেলের মজুত দ্রুত কমছে। পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের ড্যান পিকারিং জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের মজুত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু গত পাঁচ মাসে তা ১৩০ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত বসন্তের পর থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল কমে ১৯৮৩-পরবর্তী সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। কংগ্রেস নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমায় পৌঁছানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আর মাত্র ৬ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহারের সুযোগ আছে। বাণিজ্যিক মজুতও সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জুনে সতর্ক করে বলেছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে ‘অর্থনৈতিক বিপর্যয়’ হতে পারে।
চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করায় যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তাদের আমদানি কমে যায়। তবে নাতাশা কানেভার মতে, আরও তিন-চার মাসের মধ্যেই চীনকে আবার তেল আমদানি বাড়াতে হবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের ডান স্ট্রুইভেন মনে করেন, অক্টোবরের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে। আরসিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফটের আশঙ্কা আরও গভীর—মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।




